স্টাফ রিপোর্টার
চুয়াডাঙ্গা জেলার দুটি সংসদীয় আসনে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সকাল থেকে জেলার বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। বেলা বাড়ার সাথে ভোটারদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। বিশেষ করে শহরের থেকে গ্রামে ভোটারদের উপস্থিতি আরো বেশি ছিলো। দিন শেষে গত ৪টি সংসদ নির্বাচনের রেকর্ড ভেঙ্গে ৭৬ ভাগ ভোট পোল হয়েছে বলে বেসরকারীভাবে জানা গেছে। বিশেষ করে পুরুষ ভোটারের তুলনায় নারী ভোটারের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো, যা নির্বাচনের একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন পর নিজের ভোটটি দিতে পেরে অনেকে উচ্ছাস প্রকাশ করেছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টায় একযোগে ভোটগ্রহণ শুরু হয়, কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা ছাড়াই বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত চলে। জেলার চুয়াডাঙ্গা-১ ও চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের প্রতিটি কেন্দ্রেই ভোটারদের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। নারী ভোটাররা সকাল থেকেই কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নেওয়া হয় ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্রতিটি কেন্দ্রে পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ, আনসার ও গ্রাম পুলিশ মোতায়েন ছিল। পাশাপাশি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের তত্ত্বাবধানে সার্বিকভাবে নির্বাচন পরিচালিত হয়। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শান্ত পরিবেশ ও নিরাপত্তার কারণে তারা নির্ভয়ে ভোট দিতে পেরেছেন।
নারী ভোটাররা জানান, অতীতের তুলনায় এবার তারা আরও বেশি উৎসাহ নিয়ে ভোটকেন্দ্রে এসেছেন। অনেক নারী ভোটার সন্তানদের সঙ্গে নিয়েও কেন্দ্রে উপস্থিত হন, যা নির্বাচনের আনন্দঘন পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। ভোটগ্রহণ শেষে কেন্দ্রে কেন্দ্রে ব্যালট বাক্স সিলগালা করে ফলাফল সংগ্রহ ও গণনার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
এম এ বারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র, একাডেমি উচ্চ বিদ্যালয়, রেলবাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভিজে সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়, রাহেলা খাতুন উচ্চ বিদ্যালয়, টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ, খাদিমপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়, কুলপালা প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইব্রাহিম প্রাথমিক বিদ্যালয়, দর্শনা সরকারী কলেজ, ডুগডুগি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জীবননগর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, খয়েরহুদা প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাশিপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেলগাছি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও আলমডাঙ্গা পাইলট বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, ভোটাররা লাইনে দাড়িয়ে ভোট দিচ্ছে। প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে বিএনপির বিপুল সংখ্যক নেতা কর্মিদের দেখা গেলেও অন্য প্রার্থীদের নেতা কর্মিদের তেমন একটি জটলা দেখা যায়নি। অনেকটা নিরব ছিলো জামায়াতের কর্মিরা। অনুমান করা যায়নি জামায়াত এসব কেন্দ্রে বিজয় লাভ করবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে নির্বাচনকালীন সময়ে কেন্দ্রের যে তথ্য পাওয়া যায় সেগুলো হল, চুয়াডাঙ্গা রেল বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা ছিলো ৩৭০৪। এর মধ্যে পুরুষ ১৭০৯ মহিলা ১৯৮৫ ভোটার ছিল। ভোট গ্রহণের প্রথম ঘণ্টায় এই কেন্দ্রে ভোট পোল হয়েছিল ২৭১ টি এবং গণভোট ২৭১ টি। যার শতকরা হারছিল ৭.৩১। এদিকে চুয়াডাঙ্গা পৌর কলেজে পুরুষ কেন্দ্রে মোট ভোট ছিল ২৬৯০।
এ কেন্দ্রে দ্বিতীয় ঘণ্টায় সংসদীয় ভোট পোল হয়েছিল ৪৭৭টি ও গণ ভোট হয়েছিল ৪৭৭টি। যার শতকরা হার ছিল ১৭.৭৩। চুয়াডাঙ্গা পৌর কলেজের মহিলা ভোটকেন্দ্রে মোট ভোট ছিল ৩০৯০। দ্বিতীয় ঘণ্টায় এ কেন্দ্রে সংসদীয় ভোট পোল হয়েছিল ৩৯৪ টি ও গণভোট পোল হয়েছিল ৩৯৪ টি। যার শতকরা হার ১২. ৭৫। খাদিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে মোট ভোট ছিল ৩২৮৬। চতুর্থ ঘন্টায় এ কেন্দ্র সংসদীয় ভোট পোল হয়েছিল ১০১১ টি। গণভোটও পড়েছিল ১০১১ টি । যার শতকরা হার ছিল ৩০ শতাংশ। বটিয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পুরুষ ভোটার কেন্দ্রে ২৯৬৮। তৃতীয় ঘন্টায় এ কেন্দ্রে ভোট পোল হয়েছিল ৬৬৬ টি। যার শতকরা হার ছিলো ২৫. ১০। পাঁচকমলাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে মোট ভোট ছিল ২২৬০। চতুর্থ ঘন্টায় এ কেন্দ্রে ভোট ভোট পোল হয়েছিল ১১৩৭। গণভোট ও একই পরিমাণ ছিলো। যার শতকারা হার ছিল ৫০.৩০। চুয়াডাঙ্গা রাহেলা খাতুন গার্লস একাডেমির পুরুষ ভোটকেন্দ্রে মোট ভোট ছিল ২১৫৭ টি। এরমধ্যে পঞ্চম ঘন্টায় এ কেন্দ্র ভোট পোল হয় ১২০১ টি। যার শত তারা হার ৫৬শতাংশ । চুয়াডাঙ্গার রাহেলা খাতুন গার্লস অ্যাকাডেমির মহিলা কেন্দ্রে মোট ভোট ছিল ২৪৮৪ টি। পঞ্চম ঘন্টায় এ কেন্দ্রে ভোট পোল হয়েছিল ১১৭৯ টি। যার শতকরা হারছিল ৪৭.৪৬। নির্বাচন চলাকালীন সময়ে কেন্দ্র পরিদর্শন করে এসকল তথ্য পাওয়া যায়।
চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আজ সার্বিকভাবে সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিরপেক্ষ পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। আমার নির্বাচনী এলাকা চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের প্রায় ২৫টি ভোটকেন্দ্র আমি নিজে পরিদর্শন করেছি। প্রায় সব কেন্দ্রেই শান্তিপূর্ণ ও স্বাভাবিক পরিবেশ লক্ষ্য করেছি। কোথাও কোথাও ছোটখাটো কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও তা বড় কোনো সমস্যায় রূপ নেয়নি।
তিনি আরোও বলেন, ভোটার উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। আমার ধারণা, এ আসনে ভোট প্রদানের হার ৭০ শতাংশেরও বেশি হবে এমনকি এর চেয়েও বেশি হতে পারে। বিশেষ করে এক কেন্দ্র থেকে আরেক কেন্দ্রে যাওয়ার পথে নারী ভোটারদের দীর্ঘ সারি ছিল, যা আমাকে অত্যন্ত আশাবাদী করেছে। আপনারা জানেন, এবার প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে দুটি ব্যালট বাক্সের ব্যবস্থা ছিল, যা ভোটারদের অংশগ্রহণকে আরও উৎসাহিত করেছে। আমি নিজেও ভোট প্রদানের সময় সাধারণ ভোটারের মতো লাইনে দাঁড়াতে চেয়েছিলাম। তবে যেহেতু এটি আমার এলাকা ও আমার কেন্দ্র, সেখানে উপস্থিত সম্মানিত ভোটাররা আমাকে সম্মান জানিয়ে অনুরোধ করেন প্রার্থী হিসেবে যেন আমি সবার আগে ভোট দিয়ে চলে যাই। যদিও তাদের এই ভালোবাসা ও সম্মান আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে, তবুও আমি বিশ্বাস করি লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেওয়ার আইন সবার জন্য সমান। নির্বাচনী মাঠে বড় ধরনের কোনো সমস্যা না থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিশেষ কোনো কঠোর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি। তবুও পুরো নির্বাচনজুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ছিল দায়িত্বশীল, পেশাদার এবং প্রশংসনীয়। সব মিলিয়ে, এই নির্বাচন গণতন্ত্রের জন্য একটি ইতিবাচক উদাহরণ হয়ে থাকবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনকালে নিরাপত্তা কর্মীরা জানান, ভোটকেন্দ্রে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটাররা নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত কঠোর। কেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে কোন জটলা হতে দেননি নিরাপত্তা কর্মীরা। সেই সাথে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, সেনাবাহিনী, র্যাব এবং আনসার ব্যাটালিয়নের টহল ছিল বেশ। অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই অনুষ্ঠিত হয়েছে এই জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সার্বিকভাবে চুয়াডাঙ্গার দুই সংসদীয় আসনে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন সাধারণ ভোটার থেকে শুরু করে প্রশাসন ও নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা।
চুয়াডাঙ্গায় উৎসবমুখর পরিবেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন



