স্টাফ রিপোর্টার
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চুয়াডাঙ্গায় উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। জেলা জামায়াতের আমীর রুহুল আমিন পথসভা, জনসংযোগ ও সমাবেশ করে চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়া, দেশের সার্বিক উন্নয়ন, রাষ্ট্র সংস্কার ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ নানান প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন এ নেতা।
চুয়াডাঙ্গা-২ আসন থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করার জন্য মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী রুহুল আমিন। জেলা জামায়াতের আমীর রুহুল আমিন একজন আয়কর আইনজীবী ও ব্যবসায়ী। জেলার জীবননগর উপজেলার ধোপাখালি মন্ডল পাড়ায় তার স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা। তার পিতার নাম আব্দুল খালেক, মাতার নাম বুলবুলি খাতুন। স্ত্রী স্বপ্না খাতুন পেশায় শিক্ষক। ৪ জানুয়ারী ১৯৮০ সালে জন্ম নেয়া এ রাজনৈতিক নেতা ১ ছেলে ও ১ মেয়ের জনক। ১৯৯১ সালে ইসলামী ছাত্রশিবিরের মাধ্যমে রাজনীতীতে হাতে খড়ি রুহুল আমিনের। ২০০৩ সালে ছাত্রশিবিরের জেলা সভাপতি নির্বাচিত হন এ নেতা। এরপর ২০০৯ সালে জেলা জামায়াতের যুগ্ন সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে সাধারন সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব গ্রহন করেন। ২০২২ সাল থেকে জেলা জামায়াতের আমীর নিযুক্ত হন। ২০০৯ সালে জীবননগর উপজেলা পরিষদে উপজেলা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করে সামান্য ভোটের ব্যবধানে তিনি পরাজিত হন। ২০১৮ সালে চুয়াডাঙ্গা-২ আসন থেকে স্বতস্ত্র প্রার্থী হিসাবে সংসদ সদস্য পদে মনোনয়পত্র দাখিল করেছিলেন জামায়াতের এই নেতা।
দৈনিক আজকের চুয়াডাঙ্গার সম্পাদক বিপুল আশরাফের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে জেলা জামায়াতে আমীর ও চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী রুহুল আমিন জানান, চুয়াডাঙ্গার গণমানুষের অধিকার আদায়ের সর্বদা প্রস্তুত তিনি। আসন্ন নির্বাচনে ন্যায় ও নিষ্ঠার পথে সকলে জামায়াত ইসলামির দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ভোট দেবে বলে তিনি আশাবাদী।
আজকের চুয়াডাঙ্গা: ১. আপনার এলাকার ভোটারদের নিয়ে আপনার নির্বাচনী প্রতিক্রিয়া কি?
রুহুল আমিন : চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী রুহুল আমীন বলেন, আমরা দুর্নীতি দুঃশাসনকে রোধ করে এগিয়ে যেতে চাই। এই ৫৪ বছরে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারেনি শুধু এই দুর্নীতি দুঃশাসনের কারণে। আমরা এই দুর্নীতি দুঃশাসনকে জাদুঘরে রেখে এগিয়ে যেতে চাই। এলাকার মানুষ সরকারের কাছে যে অনেক বেশি কিছু চায় তা না, সে যে রাস্তা দিয়ে চলবে সেই রাস্তাটা ভালো চায়, সে যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়বে সে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটাকে ভালো চায়, সে যেখানে চিকিৎসা নিতে চায় সেখানকার চিকিৎসা ব্যবস্থা ভালো চায়। আমরা সর্বপ্রথম জনগণের এই প্রত্যাশা গুলো পূরণ করার লক্ষ্য অর্জন করতে চাই। যদি আমরা দুর্নীতিকে রুখে দিতে পারি চাঁদাবাজিকে রুখে দিতে পারি, সমাজের ক্ষতিকর মানুষগুলোকে রুখে দিতে পারি, তাহলে এই জাতি শান্তির নিঃশ্বাস ফেলবে বলে আমরা প্রত্যাশা করি। সেজন্য আমাদের যে কাজটুকু করার প্রয়োজন সেগুলো আমরা সবই করব।
আজকের চুয়াডাঙ্গা: ২. নির্বাচনী আচরণ বিধি পালনে নেতাকর্মীদের প্রতি আপনার নির্দেশনা কি?
রুহুল আমিন: আইনের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল সেটা আমরা আগেও প্রমাণ দিয়েছি, এখনো প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছি। নির্বাচনে নমিনেশন পেপার উত্তোলন, নমিনেশন পেপার জমা দেওয়া, নমিনেশন পেপার বাছাই, এই কাজগুলো হয়েছে। এখন ভোট চাওয়ার ক্ষেত্রে হ্যান্ডবিল বিতরণ করা যাবে না, মাইকে প্রচার প্রচারণা করা যাবে না, এগুলা আমরা অক্ষর অক্ষরে মানি। আমাদের কর্মীরা এক্ষেত্রে অনেক গুরুত্ব ও দায়িত্বশীল আচরণ করেন। আমাদের কর্মীদেরকে আমরা নির্বাচনে আচরণ মেনে চলার আদেশ দিয়েছি। আমাদের কর্মীরা যদিও বলে যে, অন্যরা ফ্যামিলি কার্ড দেখাচ্ছে, হ্যান্ডবিল বিতরণ করছে, লিফলেট বিতরণ করছে, বিভিন্ন প্রোগ্রাম করছে, আমরা তাদেরকে বলছি যদি কেউ চুরি করে আপনারাও কি চুরি করবেন, কেউ যদি ডাকাতি করে আপনিও কি ডাকাতি করবেন, কেউ যদি আইন ভাঙ্গে আপনিও কি ভাঙবেন, তখন তারা চুপ হয়ে যায়।
আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা নিয়েই আমরা এগিয়ে যেতে চাই। আইন যদি কেউ ভেঙে ফেলে সেটা দেখার দায়িত্ব প্রশাসনের। তবে হ্যাঁ, প্রশাসন যদি এই বিষয়গুলো না দেখে, তাহলে আমাদের কর্মীরা আহত হয় এবং আমরাও কষ্ট পাই। আমি অনুরোধ করব আমার বা অন্যদের কর্মীরা যদি কোন আইন ভাঙ্গে বা আচরণবিধি লংঘন করে তাকে সতর্ক করতে হবে, এবং তাদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা উচিত। এক্ষেত্রে আমরা কোন অবস্থায় হস্তক্ষেপ করতে চাইবো না। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীদেরকে আমরা বাধা প্রদান করব না।
আজকের চুয়াডাঙ্গা: ৩. জুলাই সনদ বিষয়ক গনভোট নিয়ে আপনার অবস্থান কি?
রহুল আমিন: জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য আমরা যে আন্দোলন করেছি, সে আন্দোলন জাতি দেখেছে। ঠিক অন্যদিকে বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত ছিল, তাদের মহাসচিব একাধিকবার একথা বলেছে যে, এই আন্দোলন ছাত্রদের আন্দোলন, এর সাথে আমাদের কোন সম্পৃক্ততা নেই। এরপরও তারা এটাকে মার্কেটিং করতে চায়। জুলাই সনদ আমরা জাতীয় নির্বাচনের আগেই গণভোট চেয়েছিলাম, শুধু বিএনপির কারণে জুলাই সনদের আগে ভোটটা করা হয়নি। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করার জন্য আমরা আন্দোলন করেছি। কিন্তু সরকারের অনিচ্ছা বা অন্যদের চাপে যে কারণে কাজটি সম্পন্ন হয়নি। এখন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একইসঙ্গে হবে। যদিও এটা সাধারণ মানুষের জন্য একটু বিড়ম্বনা তবুও যে এটা হচ্ছে এটাই সৌভাগ্য। আমরা জাতীয় নির্বাচনকে যেরকম গুরুত্ব দিয়েছি, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য হ্যাঁ পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য ভোটারদেরকে উদ্বুদ্ধ করতে চাই। আমরা বিশ্বাস করি যদি হ্যাঁ জিতে যায় তাহলে জুলাই জিতে যাবে। যদি হ্যাঁ হেরে যায় তাহলে জুলাই হেরে যাবে। আমরা এই জাতির কাছ থেকে জুলাইকে হেরে যেতে দিতে চায় না। এইজন্য জুলাই যোদ্ধাদেরকে স্মরণ রেখে জাতিকে জুলাইয়ের হ্যাঁ পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য আমি যেভাবে ভোট চাচ্ছি আমার নেতাকর্মীদেরকেও সেভাবে ভোট চাইতে বলছি।
আজকের চুয়াডাঙ্গা: ৪. আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কি?
রুহুল আমিন: সব দল বিজয়ী হতে চাই, তেমন আমরাও বিজয়ী হতে চাই। কিন্তু সেটি ভোট চুরি করে না, ভোট ক্রয় করে না, দিনের ভোট রাতে নিয়ে না, সুষ্ঠু নির্বাচন করে বিজয়ী হতে চাই। আমরা ভোটারদের একটি স্বাধীন ভোট নিতে চাই এবং এর ভিত্তিতে তারা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে বেছে নিবে। শুধু প্রার্থী এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে প্রার্থীর দলীয় কর্মী, প্রার্থীর দলের লোকজন ও প্রার্থীর দলের কার্যক্রম। এখানে কখনো কখনো প্রার্থীরা দলের বাইরে যেতে পারে না, সুতরাং দলের কর্মীরা যদি খারাপ হয় তবুও তাদেরকে নিয়ে চলতে হয়। এই বিষয়গুলো ভোটাররা খুব ভালোভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। বিজয়ের জন্য যেমন আমরা প্রত্যাশা করি, সাথে সাথে ভোটারদের জন্য লেভেল প্লেইং ফিল্ড আমরা প্রত্যাশা করি। প্রশাসনের নিরাপত্তা আমরা প্রত্যাশা করি।
পুলিশ তাদের গৌরব উজ্জ্বল ইতিহাস হারিয়ে ফেলেছিল এই ১৭ বছরে, সেটা ফিরিয়ে নিয়ে আসুক এটা আমরা প্রত্যাশা করি। ভোটার রাজ্যে দীর্ঘদিন যারা ভোট দিতে পারেনি এবং এবার যারা নতুন ভোটাররা ভোট দিতে যাবে তারা যেন স্বাধীনভাবে তাদের ভোট দিতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখুক। ভোটাররা যেন যোগ্য প্রার্থীকে বেছে নিতে পারে, যেন কোন চাঁদাবাজি টেন্ডারবাজি দখলদারিত্ব প্রার্থীকে বেছে না নিতে হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ভোটারদের পছন্দের প্রার্থীকে বেছে নেওয়ার আহ্বান রাখছি।
আজকের চুয়াডাঙ্গা: ৫. নির্বাচনে জয়লাভ করলে এলাকায় কি কি উন্নয়ন করতে চান?
রুহুল আমিন: যদি নির্বাচনে নির্বাচিত হতে পারি তাহলে আমি আমাদের এখানকার রাস্তাঘাট উন্নয়ন করব। বিশেষ করে চুয়াডাঙ্গার রাস্তা চার লেনের হলে চলাচল বেশি সুবিধা হয়। আমাদের এখানে কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নেই, এখানে একটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হলে খুবই ভালো হবে। আমাদের চুয়াডাঙ্গাতে কেরু এন্ড কোম্পানি আছে, তাই একটি এগ্রিকালচার বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা খুবই ভালো পদক্ষেপ হবে। যুব সমাজের বেকারত্ব দূর করব। মাদকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে দুর্নীতিমুক্ত একটি চুয়াডাঙ্গা গড়বো। আমরা সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে তাদের প্রত্যাশাগুলো বের করার চেষ্টা করছি। আমাদের সাধ্যের মধ্যে তাদের প্রত্যাশাগুলো পূরণ করার যথাসাধ্য চেষ্টা করব।
আজকের চুয়াডাঙ্গা: ৬ আগামী সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে বলে আপনি কি মনে করছেন?
রুহুল আমিন: নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে হলে প্রশাসনকে আরেকটু জোর দিতে বলব। কারণ আমাদের রাজনীতিবিদদের অনেক সমস্যা আছে, যখন আওয়ামী লীগের কিছু নেতা কর্মী বিএনপির সঙ্গে মিশে যায় এখন তারা বিএনপি হয়ে যায়। যখন তারা নিরপেক্ষ বাড়িতে বসে থাকে তখন তাদের আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে পুলিশ ধরে নিয়ে আসে। এই যে একটা বৈষম্য এইগুলো যদি দূর হয়ে যেত তাহলে আমার মনে হয় নির্বাচনটা আরও সুষ্ঠু ও সুন্দর হতো। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডসহ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ একটি নির্বাচনের মাধ্যমে সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে বলে তিনি মনে করেন।
দৈনিক আজকের চুয়াডাঙ্গা: আমাদেরকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
রুহুল আমিন: দৈনিক আজকের চুয়াডাঙ্গাকেও ধন্যবাদ।
চুয়াডাঙ্গা-২ আসন থেকে বিএনপি, জামায়াত ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের ৩ জন প্রার্থী ভোট যুদ্ধে মাঠে রয়েছেন। ৩টি উপজেলা, ২০টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভা নিয়ে চুয়াডাঙ্গা-২ আসন গঠিত। এখানে মোট ভোট কেন্দ্র রয়েছে ১৭৪টি। ৪ লাখ ৯২ হাজার ৪৫৭ জন ভোটারের মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৪৬ হাজার ৭১৭ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৪৫ হাজার ৭৩৬ জন ও হিজড়া রয়েছে ৪ জন।



