চুয়াডাঙ্গায় গণভোট প্রচার উদ্বুদ্ধকরণে মতবিনিময় সভায় সমাজকল্যাণ বিষয়ক উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ

স্টাফ রিপোর্টার

চুয়াডাঙ্গায় গণভোট প্রচার ও ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার বেলা  তিনটায় চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ। সভাপতিত্ব করেন চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ বলেন, গণভোট জনগণের নৈতিক অধিকার ও দায়িত্ব। গণভোটের কোনো বিকল্প নেই। এই গণভোটের ক্ষেত্রে সরকার পুরোপুরি নিরপেক্ষ নয় বরং তারা একটি নির্দিষ্ট নৈতিক অবস্থান নিয়েছে। সংস্কার এবং নতুন বাংলাদেশের পক্ষে যারা আছেন, তাদের এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান আমাদের শিখিয়েছে যে আগামী দিনগুলো আগের মতো চলতে পারে না। রাষ্ট্র কাঠামোতে পরিবর্তন এবং সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। রাজনৈতিক দল ও সরকারের পালাবদলের কথা বলা হলেও মৌলিক নীতিগুলো যেন স্বচ্ছ ও অপরিবর্তনীয় থাকে সেই গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বিশেষভাবে ক্ষমতার মেয়াদের সীমাবদ্ধতা (যেমন ১০ বছরের সিলিং) রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে যাতে পুনরায় কোনো স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা তৈরি হতে না পারে। গণভোটের পক্ষে থাকাকে চব্বিশের আন্দোলনে শহীদদের পক্ষ নেওয়া, মেধাভিত্তিক সমাজ গঠন এবং স্বৈরশাসনের অবসানের পক্ষ নেওয়া। এই আন্দোলনের পর বাংলাদেশ চিরতরে বদলে গেছে এবং আগের কাঠামোতে ফিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

              তিনি আরোও বলেন, গণভোটের প্রশ্নে সরকার ও রাষ্ট্র নিরপেক্ষ নয়, নৈতিক অবস্থান থেকে আমরা সংস্কারের পক্ষে দাঁড়িয়েছি। “আপনি যদি হ্যাঁ বলেন, তাহলে আপনি সংস্কারের পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন, নতুন বাংলাদেশের দরজা খুলে দিচ্ছেন।” গণভোটকে শহীদ ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের সঙ্গে যুক্ত করে তিনি বলেন, এই গণভোটের পক্ষে দাঁড়ানো মানে ১৪০০ শহীদের পক্ষে দাঁড়ানো, ইনসাফের পক্ষে দাঁড়ানো, দুর্নীতি ও স্বৈরশাসনমুক্ত বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়ানো। যুগের পর যুগ একই কাঠামো থাকলে আবার নতুন ফ্যাসিবাদ তৈরি হবে। তাই আমরা গণভোটের পক্ষেই থাকব।

এসময় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, আমাদের জেলা একটি সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় নির্বাচনকে ঘিরে যাতে কোনো ধরনের বাড়তি সমস্যা না হয়, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং কঠোর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। আমাদের জেলায় এর আগে কিছু বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা ঘটলেও বর্তমানে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক। গত ১৫ থেকে ২০ দিন ধরে এ ধরনের কোনো ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি এভাবে তৎপর থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে আর কোনো অনাকাংখিত ঘটনা ঘটবে না বলে আমরা আশাবাদী। এ ক্ষেত্রে আমরা সকল দপ্তরের কাছ থেকেই সর্বাত্মক সহযোগিতা পাচ্ছি। সব দপ্তর সম্মিলিতভাবে গণভোট সফল করার পক্ষে কাজ করছে।

জেলা প্রশাসক আরও বলেন, জেলার প্রত্যেকটি মসজিদ কমিটির সভাপতিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করা হয়েছে। বৈঠকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে মসজিদে ধর্মীয় বয়ানের সময় কোনো রাজনৈতিক আলোচনা করা যাবে না। তবে গণভোটের বিষয়টি নিয়ে সাধারণ আলাপ-আলোচনা করা যাবে।

সভায় পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, এবারের নির্বাচন বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে শুধু আরেকটি নির্বাচন নয় এটি আমাদের জন্য একটি ঐতিহাসিক ও ঈমানী দায়িত্ব। আমরা বিশ্বাস করি, এবারের নির্বাচন একটি আদর্শ ও মডেল নির্বাচন হিসেবে দেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমি এখানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করতে চাই।

প্রথমত, নিরাপত্তা। নির্বাচনকে ঘিরে জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে পুলিশ ও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিটি স্তরে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছি এবং আধুনিক বিভিন্ন সরঞ্জামও সংযুক্ত করা হচ্ছে। এর ফলে নির্বাচন চলাকালে একটি উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এই বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সকল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত রয়েছে এবং তারা সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবে।

দ্বিতীয়ত, ভোট ও গণসচেতনতা। এবারের নির্বাচন শুধু ভোট প্রদানেই সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে গণভোট ও জনসম্পৃক্ততার বিষয়টিও গভীরভাবে যুক্ত। আমাদের উপদেষ্টা মহোদয় বারবার গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন এই বার্তাটি প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে দিতে হবে। আমরা যারা শিক্ষিত, তারা বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারি, নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ, এর সুফল কী এসব আমরা বুঝতে পারি। কিন্তু সমাজের সেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, যারা মাঠে-ঘাটে শ্রম দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে, তারা অনেক সময় এসব বিষয় সহজে বুঝতে পারে না। তাই আমাদের দায়িত্ব হলো সহজ ভাষায়, বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে তাদের বোঝানো যে এই নির্বাচন কেন তাদের জন্য কল্যাণকর, কেন তাদের ভোট দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ এবং এর মাধ্যমে তারা কীভাবে নিজেদের ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করতে পারে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে চাই এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

মতবিনিময় সভায় আরো বক্তব্য রাখেন, চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান, জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আহমেদ আলী, জেলা তথ্য অফিসার শিল্পী মন্ডল, সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক সিদ্দিকা সোহেলী রশিদ, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে উপপরিচালক দীপক কুমার সাহা, এবি পার্টি চুয়াডাঙ্গা জেলা শাখার সভাপতি আলমগীর হোসেন, চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাব সভাপতি নাজমুল হক স্বপন প্রমুখ।

সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক শারমিন আক্তার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক  বি.এম. তারিক-উজ-জামান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) নয়ন কুমার রাজবংশী, সিভিল সার্জন ডা. হাদি জিয়া উদ্দিন, বিজিবি চুয়াডাঙ্গা ৬ ব্যাটালিয়নের উপপরিচালক মেজর মাসুদ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাসুদুর রহমান সরকারসহ জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের প্রতিনিধি এবং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।