স্টাফ রিপোর্টার
কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে চুয়াডাঙ্গায় কৃষি প্রযুক্তি প্রদর্শন মেলা ২০২৬ এর উদ্বোধন করা হয়েছে। গতকাল সোমবার সকাল ১০ টায় সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে তিন দিনব্যাপি এ কৃষি প্রযুক্তি প্রদর্শন মেলার উদ্বোধন করা হয়। বেলুন উড়িয়ে ও ফিতা কেটে মেলার উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেন। পরে উপজেলা পরিষদ চত্বরে এক বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। এ সময় মেলায় প্রদর্শনকৃত ১৪ টি স্টল পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেন। পরে মেলা চত্বরে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মাসুদুর রহমান সরকারের সভাপতিত্ব অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আনিসুর রহমান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকদের জীবনমান উন্নয়ন সম্ভব। কৃষিকে টেকসই করতে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগের বিকল্প নেই। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রযুক্তির প্রয়োজন রয়েছে। প্রযুক্তি আমাদের কাজকে সহজ করে এবং উন্নয়নের পথকে গতিশীল করে। উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষিত মানুষ দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা করে নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে।
তিনি আরোও বলেন, আমাদের এই অঞ্চলের মানুষ এখনো প্রযুক্তির দিক থেকে অনেক পিছিয়ে। গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার অভাব রয়েছে। তবে আজকের এই মেলায় যে প্রযুক্তিগুলো প্রদর্শিত হয়েছে, সেগুলো থেকে আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি। এখানে উপস্থিত কৃষক ও উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এসব প্রযুক্তির ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা নিতে পারবেন। কৃষকরা সাধারণত শুধু উৎপাদন বাড়ানোর দিকেই বেশি মনোযোগ দেন। কিন্তু উৎপাদনের পাশাপাশি আরও অনেক বিষয় বিবেচনায় নেওয়া জরুরী। নইলে আমরা দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির মুখে পড়ব।
খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য আমরা অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার করি। এতে সাময়িকভাবে ফসল ভালো হলেও জমির উর্বরতা নষ্ট হয়ে যায়। পরে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আরও বেশি সার প্রয়োগ করতে হয়, ফলে খরচ বেড়ে যায়। এখন থেকে এই ভুল আর করা যাবে না। জমিতে যতটুকু সার প্রয়োজন, তার বেশি ব্যবহার করা যাবে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের নির্দিষ্ট মাত্রা রয়েছে। অতিরিক্ত ব্যবহারে বৃষ্টির পানিতে তা ধুয়ে খাল-বিল ও জলাশয়ে চলে যায়, ফলে মাছ ও উপকারী পোকামাকড় ধ্বংস হয়ে যায়। ফসল রক্ষার নামে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের বিষয়টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাই কীটনাশকের ব্যবহার কমাতে হবে এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রাকৃতিক উপায়ে পোকামাকড় দমন করতে হবে। প্রকৃতির ওপর আমরা অনেক সময় অমানবিক আচরণ করি। ব্যাঙ, টিকটিকি, পাখি মেরে ফেলি। অথচ প্রকৃতির নিজস্ব খাদ্যচক্র রয়েছে। এসব প্রাণী কমে যাওয়ায় মশাসহ ক্ষতিকর পোকামাকড় বেড়ে যাচ্ছে।
পানি ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা মাটির নিচের পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। খাল-বিল-পুকুর থাকা সত্ত্বেও ডিপ টিউবওয়েল ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধারে কমপক্ষে ৩০ বছর সময় লাগে। জমির পাশে খাল, বিল বা পুকুর থাকলে সেখানকার পানি ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকবে।
সভাপতির বক্তব্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাসুদুর রহমান সরকার বলেন, এই মেলার আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য হলো এখানে প্রদর্শিত বিভিন্ন আধুনিক ও প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো যেন আমাদের কৃষক ভাইয়েরা ভালোভাবে জানতে ও আয়ত্ত করতে পারেন। আজকের এই মেলায় নানান ধরনের কৃষি ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি প্রদর্শন করা হয়েছে। যেখানে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা প্রতিটি প্রযুক্তি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করছেন।

তিনি বলেন, আপনারা যারা এখানে উপস্থিত হয়েছেন, তারা এসব প্রযুক্তি মনোযোগ দিয়ে দেখবেন, শিখবেন এবং নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে অন্যদের মাঝেও এই প্রযুক্তিগুলোর কথা তুলে ধরবেন। এই মেলায় পরিবেশ সম্পর্কিত প্রযুক্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এখানে একটি তেল মাড়াই যন্ত্র প্রদর্শন করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে সরাসরি তেল উৎপাদনের প্রক্রিয়া দেখানো হবে।
আমরা বর্তমানে যে সয়াবিন তেল খাচ্ছি, তা প্রকৃত অর্থে অনেক ক্ষেত্রেই মানসম্মত সয়াবিন তেল নয়। অনেক সময় এটিকে ‘পাম অয়েল’ বলা হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য উপযোগী নয়। প্রকৃত সয়াবিন তেল হলে তা অবশ্যই ভালো, কিন্তু আমরা সেটি সবসময় পাই না।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, একসময় আমাদের দেশের ঐতিহ্য ছিল সরিষার তেল। আমাদের পূর্বপুরুষরা সরিষার তেল ব্যবহার করে রান্না করতেন এবং তাদের স্বাস্থ্যও ভালো ছিল। বর্তমানে আমাদের দেশে সরিষার উৎপাদন যথেষ্ট হলেও সেই অনুপাতে সরিষার তেলের ব্যবহার ও উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। তেল আমদানির উপর নির্ভরতা কমলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও অর্জন করা যাবে। ফলে দেশও এগিয়ে যাবে উন্নয়নের পথে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাত আরা, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান ও কৃষি) দেবাশীষ কুমার দাস, অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্ভিদ সংরক্ষণ) মিঠু চন্দ্র অধিকারী প্রমুখ।
মেলায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে ১৪টি স্টল স্থাপন করা হয়। এসব স্টলে উন্নত জাতের ফসল, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি ও কৃষিযন্ত্র প্রদর্শন করা হয়। মেলায় কৃষক ও সাধারণ মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়।



