“নববর্ষের ঐকতান
গণতন্ত্রের পুনরুস্থান”
শুভ নববর্ষ ১৪৩৩। আবহমান বাংলার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এই বাংলা নববর্ষ। আসুন অতীতের সকল জরা-জীর্ণ মুছে ফেলে একরাশ হাসি, আনন্দ আর গান ও ভালোবাসা দিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নিই; আর সুখী, সমৃদ্ধশালী, ক্ষুধামুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত, মাদকমুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত সোনার বাংলা গড়ার সংকল্প গ্রহণ করি। আগামী দিনের মুহুর্তগুলোকে সাধনায় মহিয়ান করে তুলতে পারলেই জীবনে আসবে সফলতা। তাইতো কবির সুরে সুর মিলিয়ে বলতে হয়-
“পুরাতন আজ যাক চলে যাক অতীতে মিশে
নতুন দিনের সূর্য উঠুক জীবনে হেসে।
সবার জীবনে আসুক এবার খুশির দিন
অরুণ আলোয় ফুটুক মনে স্বপ্ন রঙিন।”
আমাদের দেশের মানুষের জীবনবোধ, জীবনযাত্রা ও প্রকৃতির বিচিত্রতার আলাকে সৃষ্ট এ বাংলা সন এবং বাঙালি সংস্কৃতি। কিন্তু সম্প্রতিকালে দেখা যায় যে, পশ্চিমা সংস্কৃতির আগ্রাসী আবরণে আমাদের বাঙালির শিকড় সংস্কৃতির রূপ ঔজ্জ্বল্য অনেকটাই ম্লান। এতদসত্বেও প্রতি বছর নববর্ষের বর্ণীল বৈশাখী শোভাযাত্রা, বৈশাখী মেলা, ঐতিহ্যবাহী বাঙ্গালীর লাঠি খেলা, হাল খাতা, পানতা-ইলিশ, গান বাজনা নানান উৎসব স্মরণ করিয়ে দেয় বাঙালির হাজার বছরের লালিত বাংলার সাংস্কৃতিক ধারাকে, প্রেরণা যোগায় সুস্থ্য সংস্কৃতি চর্চার। ১ বৈশাখ বাঙালি জাতির এক জাতীয় উৎসবের দিন। এই দিন বাঙালি জীবনের নবচেতনার আলোকে নতুন জীবনের অবগাহনের দিন। বাঙালি মনে করে জীবনের প্রতিটি দিন নববর্ষের প্রথম দিনটির মত হউক।
মধ্যযুগে সন গণনা করা হত চন্দ্রমাস দেখে। কিন্তু সৌর বছরের চেয়ে চন্দ্র বছর ১১ দিন কম হওয়ায় চন্দ্রমাসের পরিবর্তে সৌরমাস সন গণনা হয়ে থাকে। বাংলার সুলতান হোসেন শাহের আমল থেকে সন গণনা চালু হলেও মূলত মোঘল সম্রাট আকবরই ১৫৮৪ খ্রি: প্রথম বাংলা সন চালু করেন এবং সে সময় থেকেই বাংলা সন গণনা হয়ে আসছে। উল্লেক্ষ যে, সন শব্দটি আরবি শব্দ এবং সাল শব্দটি ফারসি শব্দ থেকে এসছে।
অতীতে কৃষকরা নবান্ন উৎসব করত ঘরে যখন নতুন ধান উঠত। সেই মাসটি ছিল অগ্রহায়ণ মাস। তখন এ মাসে খাজনা ও ঋণ পরিশোধ করত। জমিদাররা ঐ সময় খাজনা আদায় করত। নতুন ধানের পিঠা ও গুড়ের পায়েস রান্না করে নবান্ন উৎসব পালন করত। পরে সন গণনা পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু করে। সেই নবান্নের আনন্দ বাঙালি এখন বৈশাখে করে। খাজনা আদায়, ঋণ পরিশোধ এখন বৈশাখ থেকে হয়। বৈশাখে কৃষকরা পানতা খেয়ে মাঠে ধান কাটতে যেত। কিন্তু কালের পরিবর্তনে কৃষকের সেই পানতা চলে এসেছে শহরে। এখন গ্রামের কৃষকরা গরম ভাত খেয়ে মাঠে যায় ধান কাটতে, আর শহরের বাবু-সাহেবরা শখ করে পানতা-ইলিশ, আলু-ভর্তা ইত্যাদি আয়োজনে মেতে ওঠে। তবে এখন আর সে ইলিশ দেখা যায় খুব কম। কৃষকের সেই আনন্দ আর নেই। সেই আনন্দ চলে এসেছে শহরের বাবুদের ঘরে। আজ শহরের বৈশাখী শোভাযাত্রায় আসে গরুর গাড়ি, সেও আবার ভ্যানের উপর টাপা দেওয়া, বধুবেশে পালকি, কাপড়ের বা কাগজের, সেই কাঠের পালকি আর নেই। সেই কাঁচি, ঝাটা, বাড়ুন, মাছ ধরা বাঁশের যন্ত্রসহ বিভিন্ন সাজে সজ্জিত আবাল-বৃদ্ধ, বালক ও ছাত্র-ছাত্রী বৈশাখী শোভাযাত্রা বের করে শহর প্রদক্ষিণ করে। আসুন নবতরঙ্গে আনন্দ ঘন্টার ধ্বনি প্রত্যন্ত প্রান্তরে ছড়িয়ে দিই। নতুন বাংলা গড়ার শপথ নিই।
কবির ভাষায়-
“বাংলার মাটি বাংলার জল
পূণ্য হউক, পূণ্য হউক”
গ্রাম্য বৈশাখী মেলা বাংলা সংস্কৃতির অপরূপ বৈশিষ্ট্য। গ্রাম-বাংলার মানুষ বৈশাখী মেলায় মেতে ওঠে। বাতোসা, জিলাপি, মুড়ি, মুড়কি, খই, চিনির তৈরি বিভিন্ন রকমের ছাঁচ, রসগোল্লা, হাতের তৈরি পিঠা, তিলের খাঁজা, খেলনা-পুতুলের দোকান, বাঁশি, ডুগডুগি, একতারা, বাঁশ-বেতের সামগ্রী, মৃৎশিল্পের জিনিসপত্র ইত্যাদি মেলার প্রধান আকর্ষণ। এছাড়াও পুতুল নাচ, নাগরদোলা, ঝাপন খেলা, মৃত্যুকুপ ও যাত্রাপালা সেই অতীত আনন্দ খুজেঁ পাওয়া যায় না।
বাঙালির আরও একটি উৎসব হালখাতা। গ্রাম-বাংলার ব্যবসায়ি দোকানির মনেও পহেলা বৈশাখ আনন্দধারা বয়ে দেয় হালখাতার মধ্য দিয়ে। এ দিন ছোট-বড় দোকানি ও মহাজন তাদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান রঙিন কাগজ ও গেট বানিয়ে সাজান। মাইকে গানে গানে মাতিয়ে তোলেন দোকান-গদিঘর। লালসালুর বাঁধানো নতুন খাতা নিয়ে বসেন দোকানি মহাজনরা। পাওনাদার খরিদ্দার লক্ষ্মীরা বকেয়া পাওনা শোধ করতে হালনাগাদ করেন। পাওনাদারদের এ দিনে পেট পুরে দই-চিড়া ও মিষ্টি খাওয়ান দোকানিরা। সাজিয়ে রাখা হয় বাটা ভরা পান, থালা ভরা সুপারি আর বাটি ভরা চুন। মিষ্টি মুখ শেষে পানের খিলি মুখে দিয়ে তর্জনির আগায় চুন তুলে মুখে দিতে দিতে খরিদ্দার লক্ষ্মীরা হাসি মুখে ফিরে যান নিজ নিজ বাড়ি মুখে। এই হালখাতা উৎসব গ্রাম-বাংলার এক অতি প্রাচীন আনন্দ উৎসব। এই দিনে ইতিপূর্বে দোকানিরা মাটির থালাও ব্যবহার করত। অবশ্য শুধু গ্রাম-বাংলাই নয়, শহর-নগরেও বৈশাখের চিরায়ত অনুষ্ঠানাদি চলে দিন-রাত। রাজধানীর রমনার বটমূলে দিনভর গানে গানে, সুরে সুরে, কবিতায়, কথায়, ছড়ায়, ছন্দে ছন্দে সুরভিত হয়ে ওঠে। কবিগান, জারি, সারি, মুর্শিদি, পালা, মেঠালি, দেহতাত্ত্বিক, আধ্যাত্মিক, কথার সুর ধ্বনিতে নগরবাসীও খুঁজে পায় তার আবহমান বৈশাখীর সাধ। সেখানে শিশু, ছেলে-মেয়ে, নারী-পুরুষ, বুড়ো সকলের উচ্ছল উপস্থিতিতে মহানগরী যেন মহাস্বাধীন আনন্দে ভরে ওঠে। বৈশাখ বা নববর্ষ আমাদের কবিমনকে দোলা দিয়ে কত কবিতায়, কত ছড়ায় অবস্থান করে নিয়েছে তার হিসাব নেই। তাইতো কবি গুরু বরীন্দ্রনাথ ও কবি নজরুল বৈশাখকে স্বাগত জানিয়েছেন, “এসো হে বৈশাখ এসো………..হ্যাঁ, রবীন্দ্রনাথ বৈশাখকে গড়ার কারিগর হিসাবে দেখেছেন। যাবতীয় দুঃখ-গ্লানি, জরা-জীর্ণ, যাবতীয় প্রাচীনতা, আবর্জনা পুড়িয়ে উড়িয়ে দিয়ে প্রকৃতিকে বিশুদ্ধতায় ভরিয়ে দিতেই তিনি বৈশাখকে আহবান করেছিলেন। অন্যদিকে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলও বৈশাখকে বরণ করতে জয়গান গেয়েছেন। রুদ্র বৈশাখকে তিনি নতুন জীবনের দূত হিসেবে দেখেছেন। তাইতো তিনি বললেন-
“ঐ নতুনের কেতন ওড়ে
কাল বৈশাখীর ঝড়
তোরা সব জয় ধ¦নি কর
তোরা সব জয় ধ¦নি কর।”
এই সর্বনাশা বৈশাখী ঝড়কে আশীর্বাদ ভেবে নজরুল তার অমর সৃষ্টির ফুল ফুটিয়েছেন। বোধ হয় অন্য কোন কবিরা রবীন্দ্র-নজরুলের মত করে বৈশাখকে তুলে ধরতে পারেননি।
এদিকে কবি ফারুক হোসেনের চোখে-
“মাটির থালায় পানতা ভরা সঙ্গে ইলিশ ভাজা,
তেতুল, আচার, পেঁয়াজ কাটা, কাঁচা মরিচ তাজা।
হুমড়ি খেয়ে পড়ছে এবং খাচ্ছে মুখে-নাকে;
বাংলাদেশের বাঙালিরা পহেলা বৈশাখে।”
পরিশেষে, আমাদের দুঃখ-বেদনা, হিংসা-বিদ্বেষ, অতীতের সকল ব্যর্থতা ভুলে গিয়ে মিলেমিশে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে ধরে রাখতে হবে এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে স্বাবলম্বী হতে হবে। সর্বোপরি জীবন ধারাকে বদলাতে হবে এবং সারাদেশকে বর্ণাঢ্য বৈশাখীর মেলার মত করে সাজাতে হবে। দুর্নীতিমুক্ত, মাদকমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত ও সমৃদ্ধশালী এক নতুন বাংলা গড়তে হবে-এই হোক আজকের দিনের অঙ্গিকার।
তাইতো কবির ভাষায় বলতে হয়-
“সার্থক জনম মোর, জন্মেছি এই দেশে
সার্থক জনম মাগো, তোমায় ভালবেসে।”
“এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি
সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি।”
-সকলের জন্য রইল বৈশাখী শুভেচ্ছা।



