বিজ্ঞান আন্দোলন-৪

বিজ্ঞান বিশ্বপ্রকৃতি সম্পর্কে শুধু তথ্য ও তত্ত্বের সংগ্রাহক নয়। বিজ্ঞান একটি আধুনিক বিশিষ্ট জীবনধারাকে নিশ্চিত করে এবং নির্মাণ করতে পারে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিশ্বজগতকে ক্রমাগত জানার প্রক্রিয়ার নামই হলো বিজ্ঞান। বিজ্ঞান আসলে সেই অভিজ্ঞান বা চেতনা, যা মানুষকে প্রতিনিয়ত বাস্তবের মুখোমুখি করে, চিন্তাকে করে শাণিত। বিজ্ঞান মানুষকে যুক্তির জালে বন্দী করে ফেলে। বিজ্ঞান সব সময় আত্মপ্রত্যয় নিয়ে কাজ করে। বিজ্ঞান তাই এক ধরনের আশাবাদ। বিজ্ঞান একটি গাণিতিক কর্মধারা, সমস্যা নিরূপণের একটি কৌশল। বিজ্ঞান আসলে এক থেকে অন্যে গমন। আর বিজ্ঞানের এই কাজকে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে দিয়ে মানুষকে হতাশা ও কুসংস্কারমুক্ত করার নামই হলো বিজ্ঞান আন্দোলন।

একজন বিজ্ঞানী যখন গবেষণাগারে কাজ করেন, তখন সেখানে তিনি নিঃসঙ্গ দ্বীপের অধিবাসী। তার বিরল প্রতিভা তাকে বিখ্যাত ও বিশ্বজনীন করে তোলে। বিজ্ঞান তার নিপুণ ভাষা দিয়ে জনগণের সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে না। তাই বিজ্ঞানকে এই বন্দীদশা থেকে মুক্ত করতে হলে বিজ্ঞানকে বৃহত্তর সামাজিক প্রেক্ষাপটে স্থাপন করতে হয় এবং সাধারণ মানুষকে যেকোনো অবৈজ্ঞানিক চিন্তা থেকে মুক্ত করতে হয়, যাতে মানুষ ও বিজ্ঞান পারস্পরিকতায় সম্পৃক্ত ও সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে পারে।

বিজ্ঞান মূলত একটি অভিযান। বিজ্ঞানীকে ক্রমাগত নতুন সমস্যা ও প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। এর জন্য দরকার সাহসিকতা, মননশীলতা এবং উদ্ভাবন করার শক্তি। এসবের জন্য দরকার মুক্ত পরিবেশ যেখানে সকল বিষয় নিয়ে থাকবে প্রশ্ন করার স্বাধীনতা। সাংস্কৃতিক অর্থে এর নাম বাকস্বাধীনতা। তরুণ বিজ্ঞানশিক্ষার্থীকে প্রচুর বিজ্ঞানের বই পড়তে হয়। বিজ্ঞানের ইতিহাস জেনেই বিজ্ঞানচিন্তাকে সুষম রূপ দেওয়া সম্ভব। উদ্ভাবনমূলক বিজ্ঞান শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো বুদ্ধির মুক্তি। বিজ্ঞানের পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে একজন ছাত্র কার্যকারণে বিশ্বাসী হয়ে ওঠে। ফলে সামাজিক যেকোনো সমস্যা মোকাবিলা ও কর্তব্য নির্ধারণে সে মানসিক শক্তি অর্জন করে। বিজ্ঞান যখন মানবজীবনের সকল স্তরে প্রভাব বিস্তার করবে-তখন বিজ্ঞানী ও অ-বিজ্ঞানীকে পার্থক্য করার আর সুযোগ থাকবে না। তখন সকলেই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের প্রভাববলয়ে অন্তর্ভুক্ত হবেন।

এজন্যই দরকার বিজ্ঞান ক্লাব, বিজ্ঞান মেলা, বিজ্ঞান সভা, বিজ্ঞান সেমিনার ও বিতর্ক। নাটক, গল্প, আলোকচিত্র, বিজ্ঞানের ঘটনা, বিজ্ঞানীদের জীবনী, ভ্রাম্যমাণ মিউজিয়াম, রেডিও, টেলিভিশনসহ সবকিছুকে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানের চেতনাকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে। তাহলেই সমাজ ও মানুষের মন থেকে কুসংস্কার দূর হবে। তখন আমরা মুক্ত মন নিয়ে সকল বিষয়কে বিচার করার সাহস সঞ্চয় করব। আমাদের সকলকে মনে রাখা দরকার যে বিজ্ঞান কোনো ম্যাজিক নয়; এটি এক বুদ্ধিগত গবেষণা-কর্ম। সুতরাং গবেষণাভিত্তিক এই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তরুণ-তরুণীদের চেতনায় উদ্ভব ঘটবে বিজ্ঞান সংস্কৃতির মর্মবস্তু। তারা তখন প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশ রক্ষায় আরও সচেতন হবেন। এই বিজ্ঞান আন্দোলনকে সফল ও সার্থক করতে হলে এই আন্দোলনের সাথে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। আমাদের পারিপার্শ্বিক বস্তুগত পরিবেশ যেমন মাটি, পানি, জীবজন্তু, শস্যক্ষেত ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর তথ্য সংগ্রহের জন্য সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।

অনুসন্ধানের কাজে যে আনন্দ, নতুন প্রশ্ন উত্থাপন এবং তার জবাব খোঁজার মধ্যে যে তারুণ্যের উত্তেজনা বিরাজ করে তা আমাদের মনকে পরিতৃপ্ত করে। দেশের সব শিক্ষাকেন্দ্র, সব ল্যাবরেটরি ও প্রযুক্তি বিকাশ কেন্দ্রগুলো যখন একযোগে কাজ করবে, তখন এই আন্দোলন একটি উৎসবে পরিণত হবে। বৈজ্ঞানিক এই কর্মধারায় যখন বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, ছাত্র ও সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি সংযোগ ঘটবে তখন সেই পরিব্যাপ্ত সামগ্রিক বিজ্ঞানচেতনা ও কর্মতৎপরতায় জন্ম নেবে বিজ্ঞান সংস্কৃতি। তখন বিজ্ঞান হবে আশাবাদ ও মানবসমাজের জন্য অনন্ত শান্তি ও সৌন্দর্যের প্রতীক। লেখক-জাহিদ হোসেন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *