মুন্না রহমান, স্টাফ রিপোর্টার
শীতের শুরুতেই জমে উঠেছে চুয়াডাঙ্গা জেলার ঐতিহ্যবাহী সরোজগঞ্জ বাজারের খেজুর গুড়ের হাট। ক্রেতা বিক্রেতায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে হাট প্রাঙ্গণ। এটিই দেশের সর্ববৃহত্তম খেজুর গুড়ের হাট হিসেবে পরিচিত। শীত মৌসুমে তিনশত বছরের প্রাচীন এ হাট নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার সরোজগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার ও সোমবার বসে এ হাট। খেজুর গাছ থেকে সংগৃহীত রস দিয়ে তৈরি গুড়ের ভাঁড় নিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষক এবং ব্যাপারীরা হাজির হন ঐতিহ্যবাহী হাটে।
চুয়াডাঙ্গার সরোজগঞ্জের খেজুর গুড়ের হাট শুধু একটি বাজার নয়, এটি দেশের অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। খেজুর গাছের সংখ্যা বাড়াতে এবং গুড় উৎপাদনের মান নিশ্চিত করতে কৃষি বিভাগকে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান অনেকেই।
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জেলায় ২ লাখ ৭০ হাজার খেজুর গাছ রয়েছে। এ বছর এই গাছগুলো থেকে ২ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন খেজুর গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে প্রতি বছর খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় উৎপাদনও কমছে। সরোজগঞ্জের এ ঐতিহ্যবাহী হাট থেকে প্রতি সপ্তাহে ২০ থেকে ২৫ ট্রাক গুড় দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। গুড়ের উচ্চমান এবং স্বাদের কারণে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও যাচ্ছে চুয়াডাঙ্গায় উৎপাদিত গুড়। দেশের নানা প্রান্ত থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা আসেন এই হাটে খেজুর গুড় কিনতে। এ হাটের গুড় শুধু দেশেই নয়, সুনাম অর্জন করেছে আন্তর্জাতিক বাজারেও। প্রতি বছর এই হাটকে ঘিরে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। গুড় উৎপাদন একটি সময়সাপেক্ষ এবং শ্রমনির্ভর প্রক্রিয়া।
স্থানীয় গাছি আব্বাস আলী জানান, এবছর কার্তিক মাসের শেষের দিকেই শীত পড়তে শুরু করেছে। আমরাও শীতের শুরুতেই রস সংগ্রহের জন্য গাছ প্রস্তুতি শেষ করেছি। এখন বর্তমান যে তাপমাত্রা এতে করে বেশ ভালো মানের গুড় উৎপাদন সম্ভব। আমাদের উৎপাদিত গুড়গুলো আমরা সরোজগঞ্জ হাটেই বিক্রয় করতে নিয়ে আসি। এখানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা আসেন। তাছাড়া আমরা ন্যায্য মূল্যে গুড়গুলো বিক্রি করতে পারি। তবে গাছ কাটা, রস সংগ্রহ এবং গুড় তৈরিতে পরিশ্রম অনেক। যা লাভ হয়, তা পরিশ্রমের তুলনায় খুবই কম। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বেশি লাভের আশায় গুড়ে চিনি মিশ্রণসহ বিভিন্ন ভেজাল করে বাজারে ছাড়ছে। ফলে সরোজগঞ্জ হাটের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জের গুড় ব্যবসায়ী তরিকুল ইসলাম বলেন, প্রায় ১৫ বছর ধরে আমি এই হাট থেকে গুড় কিনে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করি। সরোজগঞ্জ হাটের গুড় সারা বাংলাদেশে বিখ্যাত। বর্তমানে গুড় পাইকারি ১৮০ টাকা কেজি দরে কেনা পড়ছে। এক ভাড় গুড় ১হাজার ৭০০ থেকে ২হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে কেনাবেচা হয়। আমরা প্রতিটি ভাড়ে কাঠি দিয়ে গুড় চেক করে তারপরে কিনি। কিছু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী গুড়ে চিনি মিশ্রিত করে থাকেন। যদি গুড়ের মান নিয়ন্ত্রণ করা না হয়, তবে এ হাটের ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে।
মাগুরা জেলা থেকে আসা ব্যবসায়ী মনিরুল ইসলাম জানান, আমি পরিচিত চাষিদের কাছ থেকে চিনিমুক্ত গুড় কিনি। এ ধরনের গুড়ের চাহিদা বেশি এবং ভালো দামেও বিক্রি করা যায়। প্রতিবছরই সরোজগঞ্জ হাট থেকে গুড় কেনা হয়। এভাবেই স্থানীয় গাছীদের সঙ্গে একটি পরিচয় তৈরি হয়েছে। যার কারণে আমি পরিচিত গাছিদের থেকেই গুড় কিনি যাতে ভালো মানের গুড়টি পাওয়া যায়। গুড়ের গুণগত মান বজায় রাখলে সরোজগঞ্জ হাটের এই ঐতিহ্য সারা জীবন অটুট থাকবে।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা কৃষি অফিসার আনিসুর রহমান বলেন, সরোজগঞ্জের খেজুর গুড়ের হাটকে দেশের সর্ববৃহৎ গুড়ের হাট বলা হয়। এখানে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত গুড় সহজেই ভালো দামে বিক্রি করতে পারেন। হাটে কোনো সমস্যা হলে তাৎক্ষণিক সমাধান দেওয়া হয়। চুয়াডাঙ্গার গুড় সুস্বাদু এবং চিনিমুক্ত হওয়ার কারণে সারা দেশ থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে আসেন।
এ হাটের ঐতিহ্য রক্ষায় সরকারি সহায়তার পাশাপাশি স্থানীয়দের সচেতনতা এবং উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি সঠিকভাবে মান বজায় রাখা যায়, তাহলে সরোজগঞ্জের গুড়ের হাট দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে।



