স্টাফ রিপোর্টার
চুয়াডাঙ্গায় জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল রবিবার সকাল সাড়ে ১০টায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে এই সভা অনুষ্ঠিত হয় । সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বি.এম তারিক উজ জামানের সঞ্চালনায় সভার কার্যবিবরণী পাঠ করেন সহকারী কমিশনার ফাহাদ চৌধুরী। এসময় জেলার সার্বিক সকল দপ্তরের কার্য়ক্রম ও উন্নয়ন গতিশীল করার জন্য আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় জেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কার্যক্রম ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে আরও গতিশীল করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন দপ্তরের চলমান কার্যক্রম, পূর্ববর্তী সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। সভায় জানানো হয়, জেলার বিভিন্ন সড়কের পাশে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ ও মরা গাছগুলো দ্রুত কর্তন করে অপসারণ করা হবে। এতে সড়কে চলাচলকারী যানবাহন ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সের রুট পারমিটের ব্যবস্থা করার বিষয়ে আলোচনা হয়। হাসপাতালের আইসিইউতে থাকা মূল্যবান যন্ত্রপাতির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এ ছাড়া চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করা, মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার, জেলার বিভিন্ন খাল খনন এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। সভায় জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুকুল কুমার মৈত্র বলেন, জেলার বিভিন্ন স্থানে থাকা মরা গাছগুলো দ্রুত অপসারণ করা হবে। এসব গাছ বন বিভাগের মাধ্যমে নিলাম করা হয়েছে। নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে গাছগুলো বিক্রি করা হবে।
পৌর প্রশাসক শারমিন আক্তার বলেন, জেলায় বর্তমানে ডেঙ্গুর উপদ্রব বেড়েছে। এ কারণে চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার ড্রেনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার রাখা হচ্ছে, যাতে মশার প্রজননস্থল তৈরি না হয়। পৌরসভার পক্ষ থেকে জেলার প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি করে ফলজ ও একটি করে বনজ গাছ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ সময় চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়া উদ্দিন আহমেদ সম্প্রতি উপশম নার্সিংহোমে এক রোগীর মৃত্যুর ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ঘটনার পর নার্সিংহোমটির কার্যক্রম পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ৪ সদস্যসের তদন্ক কমিটি আগামী বৃহস্পতিবারের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে এবং বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত করা হবে। ভবিষ্যতে জেলার অন্য কোনো ক্লিনিকে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য ক্লিনিকগুলোতে তদারকি আরও জোরদার করা হবে।
জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার বলেন, জেলার সার্বিক উন্নয়নে সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। বর্ষা মৌসুমে নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পানি, ফুলের টব, ডাবের খোসাসহ বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ করতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু প্রশাসন নয়, সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে।
স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, সারা দেশেই স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে বিভিন্ন ধরনের খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। তাই চুয়াডাঙ্গা জেলার স্বাস্থ্যসেবার মান দ্রুত উন্নত করতে হবে। সদর হাসপাতালে প্রচুর ময়লা-আবর্জনা দেখা যায়, সেগুলো দ্রুত অপসারণের ব্যবস্থা করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, কয়েকদিন আগে সদর হাসপাতালে আইসিইউ সেটআপ করা হয়েছে। কিন্তু এসব মূল্যবান যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় লোকবল নিশ্চিত করা জরুরি। দামি সরঞ্জামগুলো যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণে স্বাস্থ্য বিভাগকে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। সদর হাসপাতালে মূলত দরিদ্র শ্রেণির মানুষ চিকিৎসা নিতে আসেন। তাই হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ও পরিবেশের বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে। হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে রোগী ও স্বজনদের ফেলে রাখা ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিয়ম না মানলে জরিমানার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কয়েকদিন এভাবে ব্যবস্থা নিলে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সভায় চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সভাপতি নাজমুল হক স্বপন জেলার লাইসেন্স নবায়ন না করা ক্লিনিকগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে সিভিল সার্জন জানান, এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না পাওয়াকে অনেক ক্লিনিকের লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
এ সময় পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক নরেশ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তর তাদের দায়িত্ব অনুযায়ী কাজ করছে। বিভিন্ন ক্লিনিকে পরিবেশগত ও অন্যান্য সমস্যা থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান ছাড়পত্র পাচ্ছে না। এসব সমস্যার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর দায়ী নয়, সংশ্লিষ্ট ক্লিনিক মালিকদেরই তা সমাধান করতে হবে।
জেলা প্রশাসক এ সময় অবৈধ ক্লিনিকগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, অবৈধভাবে পরিচালিত কোনো ক্লিনিককে ছাড় দেওয়া যাবে না। সম্প্রতি উপশম নার্সিংহোমের ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, কয়েকজন ব্যক্তি ফোন করে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন এবং তার ডোপ টেস্ট করানোর দাবি জানিয়েছেন। রোগীর নিরাপত্তা যেখানে নিশ্চিত নয় এবং মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে, এমন ক্লিনিক জেলায় প্রয়োজন নেই।
সভায় বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা নিজ নিজ দপ্তরের চলমান কার্যক্রম, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। পরে উপস্থিত কর্মকর্তাদের মধ্যে বিভিন্ন জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তিথি মিত্র, দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লাভলী ইয়াসমিন, জীবননগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমাইয়া সুলতানা এ্যানি, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক দীপক কুমার সাহা, জেলা তথ্য কর্মকর্তা শিল্পী মন্ডল, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সাহাবুদ্দিন, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মামুনুল হাসান, টিটিসির অধ্যক্ষ মোছাব্বেরুজ্জামানসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।



