খাঁন অনু (ঝিনাইদহ)
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে এবং কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠীর উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রায় দুই দশক আগে ঝিনাইদহে একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
কিন্তু দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং পরবর্তী ওয়ান-ইলেভেন পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি তবে এই অঞ্চলের কৃষি ও কৃষকের স্বার্থ বিবেচনায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিকল্প উদ্যোগ হিসেবে ২০০৬ সালে ঝিনাইদহ সরকারি ভেটেরিনারি কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে কলেজটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, তৎকালীন সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, ভবিষ্যতে বিএনপি পুনরায় রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে দেশের অন্যান্য সরকারি ভেটেরিনারি কলেজগুলোর মতো ঝিনাইদহ সরকারি ভেটেরিনারি কলেজকেও পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হবে। কিন্তু দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, সরকারের পরিবর্তন এবং বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অবহেলা ও প্রতিহিংসামূলক মনোভাবের কারণে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কোনো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।
বরং এক পর্যায়ে কলেজটির অস্তিত্বই সংকটের মুখে পড়লে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ২০২৩ সালে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
তবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিকদের মতে, এখন সময় এসেছে ঝিনাইদহ সরকারি ভেটেরিনারি কলেজকে আবারও স্বতন্ত্র পরিচয়ে ফিরিয়ে এনে একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করার। এর মাধ্যমে শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নই হবে না, বরং বাস্তবায়িত হবে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘদিনের অপূর্ণ প্রতিশ্রুতিও।
বর্তমানে ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদের নিজস্ব ক্যাম্পাসের আয়তন প্রায় ১০.১৭ একর। এর চারপাশে রয়েছে বিস্তীর্ণ ফাঁকা মাঠ। প্রতিষ্ঠানটির পার্শ্ববর্তী সাধুহাটি বিএডিসি বীজ উৎপাদন কেন্দ্র, সাগান্না বাঁওড় এবং হলিধানি রেশম বীজ উৎপাদন খামার, ঝিনাইদহ কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, ঝিনাইদহ সরকারি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করলে সম্ভাব্য ক্যাম্পাসের আয়তন ৩০০ একরেরও বেশি হয়। যা একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
এছাড়াও ভেটেরিনারি কলেজের কয়েক কি.মি. এর মধ্যে গড়ে উঠেছে সরকারি ছাগল উন্নয়ন খামার, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, স্লটার হাউজ, ফলিত পুষ্টি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান কৃষি, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য ও কৃষিভিত্তিক প্রযুক্তি গবেষণার জন্য বাস্তব ভিত্তিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরেও রয়েছে আধুনিক একাডেমিক ভবন, গবেষণাগার, ল্যাবরেটরি, ভেটেরিনারি হাসপাতাল, ডেইরি, ছাগল ও পোল্ট্রি খামার, অডিটোরিয়াম, শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধা, খেলার মাঠ, জিমনেশিয়াম এবং মৎস্য গবেষণার উপযোগী জলাশয়। ফলে নতুন করে বিপুল অবকাঠামো নির্মাণ ছাড়াই স্বল্প ব্যয়ে এখানে একটি আধুনিক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও সাগান্না ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী আলা উদ্দিন আল মামুন বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নের কথা চিন্তা করেই ঝিনাইদহে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁর সেই দূরদর্শী পরিকল্পনার ফল হিসেবেই ভেটেরিনারি কলেজের যাত্রা শুরু হয়েছিল। আজ যখন প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সম্ভাবনা দুটোই বিদ্যমান, তখন তাঁর সেই অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উপযুক্ত সময় এসেছে। ঝিনাইদহ সরকারি ভেটেরিনারি কলেজকে পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হলে শুধু দেশনেত্রীর স্বপ্নই বাস্তবায়িত হবে না, বরং এ অঞ্চলের কৃষি, শিক্ষা, গবেষণা ও অর্থনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা হবে।
ঝিনাইদহ জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক যমুনা টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি নাসিম আনসারী বলেন,এটি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দাবি নয়, বরং সময়ের প্রয়োজন। কৃষিনির্ভর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নের স্বার্থে ঝিনাইদহে একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এখন অত্যন্ত জরুরি।
ঝিনাইদহ জেলা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি ও প্রবীণ সাংবাদিক এম এ কবির বলেন,বিদ্যমান অবকাঠামো, গবেষণা সুবিধা ও ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় ঝিনাইদহ ভেটেরিনারি কলেজকে কেন্দ্র করে খুব সহজেই একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
ঝিনাইদহ জেলা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী আবুল বাশার বলেন,এটি শুধু একটি জেলার দাবি নয়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়নের প্রশ্ন। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে কৃষি গবেষণা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে।
সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত, দেশনেত্রীর দেওয়া ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং কৃষিনির্ভর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নের স্বার্থে বর্তমান ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদকে স্বতন্ত্র ঝিনাইদহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এ রূপান্তরের বিষয়ে দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সময়ের দাবি।
ঝিনাইদহ বাসীর প্রত্যাশা দীর্ঘ ১৯ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ঝিনাইদহ সরকারি ভেটেরিনারি কলেজকে পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করার মাধ্যমে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হবে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষির উন্নয়নে ঝিনাইদহ ভেটেরিনারি কলেজকে পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করার দাবি



