স্টাফ রিপোর্টার
চুয়াডাঙ্গায় ফার্মপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঢুকে এক নারী প্রধান শিক্ষককে মারধরের অভিযোগ উঠেছে এক অভিভাবকের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী শিক্ষিকা বিদ্যালয়ে যেতে নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়েছেন। ইতোমধ্যে ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল বুধবার বেলা ১২টা ২০ মিনিটের দিকে চুয়াডাঙ্গা পৌর শহরের ফার্মপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। লাঞ্চনার শিকার ওই শিক্ষিকার নাম কাবেরী করিম। তিনি বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে অভিভাবক ও শিক্ষিকা একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টা পাল্টি অভিযোগ করেছেন। খবর পেয়ে পুলিশের একটি টিম বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছেন।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ফার্মপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী বিসমাহ জান্নাত ঐশ্বর্য (৮)। দুপুর ১২ টার দিকে বিদ্যালয়ের ১ম-৫ম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা অ্যাসেম্বলিতে অংশগ্রহণ করে। এসেম্বলিতে জাতীয় সংগীত চলাকালীন সময়ে পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা এক শিক্ষার্থীর সাথে ঐশ্বর্যর ঝগড়া ও হাতাহাতি হয়। এ ঘটনায় এসেম্বলির পরে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা কাবেরী করিম দুইজন শিক্ষার্থীকেই কাছে ডাকেন। পরে তাদের দুজনকে শাসন করে দুই গালে দুটি চড় মারেন।
এই বিষয়টি বিসমাহ জান্নাত ঐশ্বর্য বাড়িতে এসে বাবাকে জানালে দুপুর ১২টা ২০ মিনিটের দিকে বিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী ফার্মপাড়া এলাকার বাসিন্দা ঐশ্বর্যের বাবা সামস উর রহমান শুভ বিদ্যালয়ে প্রবেশ করেন। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, এ সময় তিনি অতিরিক্ত রাগান্বিত হয়ে অসৌজন্যমূলক আচরণ করতে থাকেন। উভয় তর্কে জড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে অফিসকক্ষে বসে থাকা প্রধান শিক্ষক কাবেরী করিমকে আচমকা চড়-থাপ্পড় মারেন। পরে উপস্থিত কয়েকজন তাকে থামিয়ে বাইরে নিয়ে যান।
বিদ্যালয় সূত্র আরও জানায়, সামসউর রহমান শুভ ও মিতালী খাতুন দম্পতির মেয়ে বিসমাহ জান্নাত ঐশ্বর্য ওই বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। গত বছর সে প্রদীপন বিদ্যাপীঠের প্রথম শ্রেণীতে পড়ত। এই বছর সে চুয়াডাঙ্গা ফার্মপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হয়। তার রোল নম্বর ৪২। অভিযুক্ত অভিভাবক সামস উর রহমান শুভর স্ত্রী মিতালী খাতুন বলেন, আমার মেয়েকে প্রধান শিক্ষিকা চড় থাপ্পড় মেরেছেন। কোন বিদ্যালয়ে শিশুদেরকে মারা অপরাধ। আমার স্বামী এটির প্রতিবাদ করতে গিয়ে রাগের বশবর্তী হয়ে শিক্ষিকার সাথে অসৌজন্য মূলক আচরণ করে ফেলেন। আমার সন্তানের গায়ে হাত তোলায় আমরা চুয়াডাঙ্গা সদর থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছি।
লাঞ্ছনার শিকার প্রধান শিক্ষক কাবেরী করিম বলেন, আমি একজন শিক্ষক হয়ে শিক্ষার্থীদের যেমন আদর করি, তেমনি প্রয়োজনে একটু শাসনও করতে হয়। এ কারণেই আলতো করে একটা চড় মেরেছিলাম। কিন্তু এজন্য একজন অভিভাবক আমার অফিসে ঢুকে আমার গায়ে হাত তুলবেন, এটা আমার ধারণা ছিল না। তিনি আরো বলেন, আমি বাচ্চাদের সবসময় এটা বলি যে, অ্যাসেম্বেলি চলাকালীন যখন জাতীয় সংগীত হবে তখন সকলেই চুপচাপ থাকবে। কিন্তু ঐশ্বর্য জাতীয় সংগীত চলাকালে সহপাঠীর সঙ্গে হাতাহাতি করে এবং সমাবেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করে। সকল বাচ্চাই যাতে এ বিষয় সচেতন হয় এ কারণে আমি সবার সামনে দুজনকে শাসন করি। কিন্তু তার বাবা-মা দুজনই বিদ্যালয় প্রবেশ করে আমার সাথে এমন উদ্ধতপূর্ণ আচরণ করবে এটা আমি ভাবি নি। নিজ কর্মস্থলে এমন ভাবে লাঞ্ছনার শিকার হতে হবে এটা কখনোই আশা করিনি। আমি তাদের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করব।
ঘটনার নিন্দা জানিয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও চুয়াডাঙ্গা কেদারগঞ্জ আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সোয়াইব হোসেন বলেন, এ ধরনের আচরণ আমরা কোনো অভিভাবকের কাছ থেকে আশা করি না। এমন পরিস্থিতি হলে আমরা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানুষ করব কীভাবে।
চুয়াডাঙ্গা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, একজন শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ পেয়ে বিদ্যালয়ে পুলিশের একটি দল পাঠানো হয়েছিল। পরে জানা যায়, প্রধান শিক্ষককেও লাঞ্ছিত করেছেন ওই শিক্ষার্থীর অভিভাবক। আমরা ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে এখনো কোনো প্রকার অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার অহীন্দ্র কুমার মন্ডল বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। ঘটনা সত্য হলে এটি সত্যিই অনাকাংখিত ঘটনা। অফিসিয়ালি অভিযোগ পেলে নিয়ম অনুযায়ী অভিভাবকের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চুয়াডাঙ্গার ফার্মপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অফিসকক্ষে ঢুকে প্রধান শিক্ষিকাকে চড় মারলেন অভিভাবক!



