২৫ বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান: গ্রামে মিষ্টি বিতরণ পুলিশের দূরদর্শী মধ্যস্থতায় আলমডাঙ্গার কেশবপুরে ফিরল শান্তি

স্টাফ রিপোর্টার

নিজস্ব প্রতিবেদক: 

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার হারদী ইউনিয়নের কেশবপুর গ্রামে বিল নিয়ে দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটেছে। চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশের যুগান্তকারী ও বলিষ্ঠ মধ্যস্থতায় অবসান ঘটল দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা এই দীর্ঘস্থায়ী বিরোধের। এই বিরোধের জেরে এ পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যে অন্তত ২০ থেকে ২২টি মামলা বিজ্ঞ আদালতে ও থানায় চলমান রয়েছে। বহু হতাহত ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতও হয়েছে।

দীর্ঘদিনের এই সামাজিক বৈরিতার অবসান ঘটিয়ে গত শনিবার (২০ জুন, ২০২৬) রাতে আলমডাঙ্গা থানায় উভয় পক্ষ এক ফলপ্রসূ সমঝোতায় আসেন। পুলিশের এই ঐতিহাসিক ও সফল উদ্যোগের পর এলাকায় মিষ্টি বিতরণ করেছে গ্রামবাসীরা এবং দীর্ঘ ২৫ বছর পর পুরো গ্রামটিতে এক অভূতপূর্ব উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, কেশবপুর গ্রামে মূলত একটি  বিলের মালিকানা ও লিজ সংক্রান্ত বিষয়কে কেন্দ্র করে আধিপত্য বিস্তার করে ‘সালাম গ্রুপ’ এবং ‘মনসুর আলী চেঙ্গিস খান গ্রুপ’-এর মধ্যে গত ২৫ বছর ধরে চরম বিরোধ চলে আসছিল। এই  ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়। ২৫ বছরে এই বিবাদে দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। অনেকটা রাতের ঘুম কেড়ে নেবার অবস্থা ছিলো কেশবপুর গ্রামের বাসিন্দাদের।

এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত নিরসনে ও এলাকায় স্থায়ী শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করে চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশ। পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রুহুল কবীর খানের দিক-নির্দেশনায় বিরোধ সমাধানে সরাসরি নেতৃত্ব দেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোস্তাফিজুর রহমান। রাজনৈতিক সহযোগীতায় আরও গতিশীল হয় বিরোধ সমাধানের প্রক্রিয়া। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোস্তাফিজুর রহমান নিজে উদ্যোগী হয়ে উভয় পক্ষকে আলমডাঙ্গা থানায় ডেকে দীর্ঘ আলোচনা ও মতবিনিময় করেন। এ সময় আলমডাঙ্গা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম রোকন ও সাবেক সভাপতি শহিদুল কাউনাইন টিলু উপস্থিত ছিলেন।

এ বিষয়ে আলমডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) বাণী ইসরাঈল বলেন, “কেশবপুর গ্রামের দীর্ঘদিনের এই সামাজিক দ্বন্দ্ব নিরসনে পুলিশ সুপার মহোদয়ের নির্দেশনায় আমরা উভয় পক্ষকে নিয়ে বসেছিলাম। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার স্যার এ বিষয়ে গ্রামবাসীর সাথে মতবিনিময় করেছেন এবং সেখানে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। এখন থেকে সালাম ও চেঙ্গিস নিজেরা বসে যার যা সমস্যা আছে তা সমাধান করবেন। এবং এটি খুব দ্রুত হবে বলে তারা কথা দিয়েছেন। এই শান্তি প্রক্রিয়া বজায় রাখতে জেলা পুলিশ সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করবে এবং প্রয়োজনে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও এতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবেন। কোনোভাবেই গ্রামবাসী আর কোনো নতুন ঝামেলায় জড়াবেন না।”

দীর্ঘ ২৫ বছর পর জেলা পুলিশের এমন ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী মীমাংসায় উচ্ছ্বাস দেখা গেছে সাধারণ গ্রামবাসীদের মধ্যে। তারা জানান, “আগামী মঙ্গলবার চূড়ান্ত আপোষনামা স্বাক্ষরিত হবে। চেঙ্গিস এবং সালাম—দুজনই গ্রামে এসে আমাদের সামনে ঘোষণা দিয়ে গেছেন যে তারা নিজেরা বসে সব মীমাংসা করে নেবেন। কোনো গ্রামবাসী আর এই ঝামেলায় কখনো জড়াবে না। জেলা পুলিশের, বিশেষ করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার স্যারের এই গুরুত্বপূর্ণ ও দূরদর্শী ভূমিকার কারণে আজ আমরা অত্যন্ত আনন্দিত এবং পুরো গ্রামে দীর্ঘ ২৫ বছর পর স্বস্তি ফিরে এসেছে।”

এ প্রসঙ্গে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “আমরা আজ উভয় পক্ষকে নিয়ে বসেছিলাম এবং আলোচনা দারুণ ফলপ্রসূ হয়েছে। বস্তুত, ২৫ বছর ধরে চলা এই সংঘাতের অবসানে আমাদের আরও আগে বসা উচিত ছিল। তবে দেরিতে হলেও এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত এখন সম্পূর্ণ সমাপ্তির পথে।”

দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা এই সামাজিক দ্বন্দ্বের সফল মীমাংসার পর থানার সামনে উপস্থিত শতাধিক গ্রামবাসী স্লোগানের মাধ্যমে জেলা পুলিশ, পুলিশ সুপার এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। পরবর্তীতে বেশবপুর গ্রামেও রাতে গ্রামবাসীরা স্বতস্ফূর্তভাবে মিষ্টিমুখ করেন। দীর্ঘ ২৫ বছর পর কেশবপুর গ্রামে এক অভূতপূর্ব উৎসবের আমেজ ও সম্প্রীতির সুবাতাস বইতে শুরু করেছে।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।