দখল ও দূষণে অস্তিত্ব সংকটে চুয়াডাঙ্গার প্রধান নদী মাথাভাঙ্গা  দূষিত পানি ব্যবহারে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েছে নদী পাড়ের হাজারো মানুষ

স্টাফ রিপোর্টার
চুয়াডাঙ্গার উপর দিয়ে প্রবাহিত আন্তঃসীমান্ত নদী মাথাভাঙ্গা বর্তমানে দখল ও দূষণের কারণে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। প্রায় ১২১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদী একসময় জাহাজ চলাচলের উপযোগী থাকলেও, এখন এটি ময়লা-আবর্জনায় পূর্ণ একটি খোলা ড্রেনে পরিণত হয়েছে। চুয়াডাঙ্গা শহরের বাসা বাড়ির ময়লা আবর্জনাসহ ড্রেনের পানি গিয়ে মিশছে মাথাভাঙ্গা নদীতে। যার কারনে দূষিত হয়েছে নদীর পানি। চুয়াডাঙ্গা নিচের বাজারের আবর্জনা ও পশু রক্ত গিয়েও মিশছে নদীর পানিতে। নদী দূষণের মহাযজ্ঞ চললেও দেখবার মতো যেন কেউই নেই। এ সকল সমস্যার জন্য স্থানীয়রা চুয়াডাঙ্গা পৌরসভাকে দুষছেন। এই সমস্যা সমাধানে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে পদক্ষেপের দাবি এলাকাবাসীর।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, চুয়াডাঙ্গা পুলিশ পার্কের পাশেই বড় একটি ড্রেনের পানি গিয়ে মিশছে চুয়াডাঙ্গার প্রধান নদী মাথাভাঙ্গাতে। তাছাড়া বড়বাজার নিচের বাজারের আবর্জনা স্তূপ ও পশুর রক্ত এই নদীতে ফেলা হচ্ছে। নদীর পাড়ে দুই একটি অস্থায়ী শৌচালয়ও দেখা গেছে। বাসা বাড়ির যত ময়লা আবর্জনার ড্রেনের পানি এসেও মিশছে এই নদীতেই। নদীর দুই পাড় দখল হয়ে সেই মাথাভাঙ্গা আজ অস্তিত্ব হারানোর পথে। নদীর এই দূষিত পানিতেই চলছে নদী পাড়ের মানুষের গোসল, কাপড় ও থালাবাসন ধোয়া। তাছাড়া খাবার পানির যোগানও দিচ্ছে এই নদী। এমন দূষিত পানি ব্যবহারে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েছে নদীপাড়ের হাজারো মানুষ।
মাথাভাঙ্গা নদী বাঁচাও আন্দোলনের প্রচার সম্পাদক সানভী বলেন, চুয়াডাঙ্গা শহরের বুক চিরে বয়ে গেছে আন্তসীমান্ত নদী মাথাভাঙ্গা। অবৈধ দখল ও দূষণে এই নদী প্রায় বিলীন হওয়ার পথে। অতি তীব্র দূষণে নদীর পানি প্রায় ব্যবহারের অনুপযোগী। এই দূষণের পেছনে সবচেয়ে বেশি দায়ী চুয়াডাঙ্গা পৌরসভা। চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার প্রায় সব কয়টি ড্রেনের মুখ মাথাভাঙ্গা নদীতে ফেলা হয়েছে। যার ফলে অপরিশোধিত ব্যাপক ময়লা-আবর্জনা এবং দূষিত পানি, এমনকি দেখা গেছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার বাসিন্দাদের কারো কারো বাসার পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থার সুয়্যারেজ লাইনও সরাসরি ড্রেনে ফেলা হয়েছে। সেই ড্রেনের মাধ্যমে সেই সুয়্যারেজ ও পয়ঃবর্জ্য মাথাভাঙ্গা নদীতে পড়ছে। আমরা ‘মাথাভাঙ্গা নদী বাঁচাও আন্দোলন’ মনে করি, মাথাভাঙ্গা নদীকে যদি বাঁচাতে হয়। তাহলে অতি দ্রুত একটি বৃহৎ প্রকল্পের মাধ্যমে চুয়াডাঙ্গা পৌরসভায় এই যে ড্রেনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এই বর্জ্যকে শোধন করার জন্য একটি বৃহৎ পরিকল্পনা চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার দ্রুতই হাতে নেওয়া উচিত।
চুয়াডাঙ্গা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী নাজিম উদ্দিন বলেন, আমরা মাথাভাঙ্গা নদীর পানির সঠিক প্রবাহ এবং গভীরতা নির্ণয়ে কাজ করি। নদীর অবৈধ বাধ অপসারণে ইতোপূর্বে আমাদের অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। বর্তমানে মাথাভাঙ্গা নদীতে কোন অবৈধ বাধ নেই। মাথাভাঙ্গা নদীর পানি যে দূষিত হচ্ছে সেটি আমাদের নখদর্পনে আছে। নদীপাড়ের মানুষজন এবং চুয়াডাঙ্গা শহরের ড্রেনেজ প্রকল্পের কারণে মাথাভাঙ্গা নদী বেশি দূষিত হয়ে থাকে। আমরা এমনটাও লক্ষ্য করেছি যে, অনেকের বাসার পয়ঃনিষ্কাশনের লাইনও এই ড্রেনের সাথে সংযুক্ত। এই ড্রেনের পানি নদীতে মিশে প্রায়শই নদীর পানি দূষিত হয়ে থাকে। নদী পাড়ের মানুষ এ সকল দূষিত পানি ব্যবহারে নানাবিধ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে।
চুয়াডাঙ্গা বড় বাজার কাঁচামাল আড়ৎ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শাহ আলম বলেন, চুয়াডাঙ্গা পৌরসভা আমাদের কোন নির্দিষ্ট স্থান দেয়নি যেখানে আমরা ময়লা ফেলতে পারি। তবুও আমরা আমাদের বাজারের বর্জ্যগুলো একপাশে স্তুপ করে রাখি। পরবর্তীতে পৌরসভার ময়লাবাহী গাড়ি এসে সেগুলো নিয়ে যায়। তবুও কিছু কিছু ময়লা আবর্জনা দ্বারা মাথাভাঙ্গা নদী দূষিত হয়ে থাকে। পৌরসভা সঠিক ব্যবস্থা নিলে এই নদী দূষণ রোধ করা সম্ভব।
এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গার পৌর প্রশাসক শারমিন আক্তার বলেন, চুয়াডাঙ্গা বড় বাজারের নিচের বাজারে নিয়মিত সেনেটারি ইন্সপেক্টরকে পাঠানো হয়। বর্তমানে আমরা তাদেরকে ময়লা আবর্জনা স্তুপ করার একটা জায়গাও দিয়েছে এবং সেখান থেকে নিয়মিত পৌরসভার পক্ষ থেকে এই বর্জ্যগুলো অপসারণ করা হয়। তাছাড়া ড্রেনের বিষয়েও আমরা চোখ কান খোলা রেখেছি। কারো বাসা বাড়ির পয়ঃনিষ্কাশনের লাইন ড্রেনের সঙ্গে সংযুক্ত কিনা সেই বিষয়ে অভিযান চলমান রয়েছে। আমরাও এই মাথাভাঙ্গা নদীকে বাঁচাতে চাই। নদী দূষণ রোধে সকলকেই এগিয়ে আসতে হবে। বর্তমানে নদীর ৩৭.৫ কিলোমিটার এলাকা চুয়াডাঙ্গার আওতাভুক্ত। নদী দূষণ রোধে পরিবেশ অধিদপ্তরের পাশাপাশি সকল জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।