স্টাফ রিপোর্টার
চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানাধীন নেহালপুর ইউনিয়নের কুন্দিপুর গ্রামে পরকীয়ার অভিযোগ তুলে এক গৃহবধূ ও এক যুবককে প্রকাশ্য দিবালোকে চুল কেটে, গলায় জুতার মালা পরিয়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক বিচার নামে সংঘটিত এই ঘটনাকে অনেকেই মধ্যযুগীয় বর্বরতার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করছেন। ভুক্তভোগীরা হলেন, কুন্দিপুর গ্রামের মো. আরিফের স্ত্রী আসমা বেগম (২৫) এবং একই গ্রামের আহমদ আলীর ছেলে স্বপন (২৮)। ঘটনাটি ঘটে গত বুধবার রাতে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ তুলে গ্রামের একাংশ প্রথমে ওই নারী ও যুবককে আটক করে। পরে কোনো ধরনের আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে প্রকাশ্যে তাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। চুল কেটে অপমান, গলায় জুতার মালা পরানো এবং গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা—সবই করা হয় উৎসুক জনতার সামনে। এ সময় কয়েকজন পুরো ঘটনার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়, যা দ্রুত ভাইরাল হয়ে পড়ে এবং এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে পরকীয়া নিন্দনীয় হলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নেই—এমন প্রশ্ন তুলছেন সচেতন মহল। তারা বলছেন, চুল কেটে অপমান করা, জুতার মালা পরানো কিংবা গাছে বেঁধে রাখা কোনো সভ্য সমাজের বিচারব্যবস্থা হতে পারে না।
এলাকার সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন, পরকীয়াকে কেন্দ্র করে এমন প্রকাশ্য শাস্তি দেওয়া হলেও একই সমাজে সুদখোরি, জমি আত্মসাৎ, পারিবারিক প্রতারণার মতো অপরাধের ক্ষেত্রে কেন এ ধরনের তথাকথিত সামাজিক বিচার দেখা যায় না। সম্প্রতি একই এলাকায় এক প্রভাবশালী ব্যক্তি অন্যের স্ত্রীকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে, যেখানে কোনো সামাজিক শাস্তির নজির দেখা যায়নি।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ঘটনায় বেআইনি আটক, শারীরিক নির্যাতন, নারীর মর্যাদাহানি, প্রকাশ্যে অপমানসহ একাধিক ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, যা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। দেশের প্রচলিত আইনে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর এ ধরনের শাস্তি দেওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। অপরাধ প্রমাণের দায়িত্ব আদালতের, জনতার নয়।
দর্শনা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মেহেদী হাসান জানান, ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ভুক্তভোগীদের উদ্ধার করে হেফাজতে নেয়। তিনি বলেন, সমাজের কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার নেই। কাউকে মারধর করা বা চুল কেটে অপমান করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং এ ধরনের ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উবায়দুর রহমান সাহেল বলেন, শাস্তিযোগ্য কোনো অপরাধ হলে দেশের প্রচলিত আইন ও আদালত রয়েছে। সামাজিকভাবে কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে চুল কেটে দেওয়া বা মারধর করাও নিজেই দণ্ডনীয় অপরাধ। ভুক্তভোগীরা চাইলে এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারেন।
২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে সমাজ কোন পথে এগোচ্ছে—আইনের শাসনের দিকে, নাকি জনতার উন্মত্ততার দিকে—এই প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল। তাদের দাবি, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, আইন নিজের হাতে নেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগীদের আইনি ও মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হোক। অপরাধের বিচার হবে আদালতে, জনতার লাঠি দিয়ে নয়—সভ্য সমাজে মধ্যযুগীয় বর্বরতার কোনো স্থান নেই।



