চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন ফ্লাওয়ার মিলে আটা, ভূট্টার মোচা ও ধানের গুড়া মিশিয়ে তৈরী হচ্ছে গমের ভেজাল ভূষি লাভবান হচ্ছে মিল মালিক, ক্ষতির মুখে গো খামারিরা

স্টাফ রিপোর্টার
চুয়াডাঙ্গায় গবাদিপশুর প্রধান খাদ্য গমের ‘ভূষি’ উৎপাদনে ভেজালের অভিযোগ উঠেছে। এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী ও মিল মালিক অধিক মুনাফার লোভে আসল ভূষির সাথে দেদারসে মেশাচ্ছেন আটা, ভূট্টার মোচা ও ধানের গুড়া। মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন ফ্লাওয়ার মিল পরিদর্শন করে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে এই জালিয়াতির সত্যতা মিলেছে। এর ফলে গো খামারিরা চরম অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এছাড়া ভেজাল খাদ্য খেয়ে গবাদিপশু আক্রান্ত হচ্ছে বিভিন্ন জটিল রোগবালাইয়ে। অপরদিকে ভেজাল ভুষি উৎপাদন করে মিল মালিকরা আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যাচ্ছে। জেলার ৪ উপজেলায় ২ লাখ ৮৬ হাজার গরু ও ৭ লাখ ছাগল পালন করছে বিভিন্ন খামারী ও কৃষকরা।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, চুয়াডাঙ্গা শহর ও আশেপাশে ১০/১২ টি ফ্লাওয়ার মিল রয়েছে। এসব মিলে সুজি, ময়দা, আটা ও ভূষি উৎপাদান করা হয়। সাধারনত দেশি-বিদেশি এ গম থেকে অটোমিলে ৪ টি উপকরন অথবা বাইপোডাক্ট তৈরী হয়। এগুলো হচ্ছে আটা, ময়দা, সুজি ও ভূষি। তবে আটার থেকে ভূষির দাম বেশি হওয়ায় বেশিরভাগ মিলেই গম থেকে শুধুমাত্র ভূষি তৈরী করা হয়। দুই একটি মিলে ভূষি ও ময়দা তৈরী করা হয়। বর্তমানে মিলে পাইকারী দামে আটা বিক্রি হচ্ছে ৩৫/৩৬ টাকা কেজি দরে। অপরদিকে ভূষি বিক্রি হচ্ছে ৪১/৪২ টাকা কেজি দরে। রাশিয়া থেকে আমদানী করা  প্রতি কেজি গমের মূল্য পড়ছে ৩৬ টাকা। আর ধানের গুড়া বিক্রি হচ্ছে ১৮/২০ টাকা কেজি।
চুয়াডাঙ্গায় গম থেকে ভূষি ও ময়দা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো হলো কেদারগঞ্জে সততা ফ্লাওয়ার মিল, পুরাতন স্টেডিয়াম সংলগ্ন নীল কলম ফ্লাওয়ার মিল, ফার্মপাড়ায় মিলন ফ্লাওয়ার মিল, সাতগাড়ীতে শুকুর ফ্লাওয়ার মিল, কিনাত আলী ফ্লাওয়ার মিল, আলুকদিয়ায় ইনসাফ ফ্লাওয়ার মিল, হাজরাহাটি যমুনা ফ্লাওয়ার মিল, হাতিকাটায় জাহিদ ফ্লাওয়ার মিল, বাদুরতলায় হাসান ফøাওয়ার মিল উল্লেখযোগ্য।
চুয়াডাঙ্গার বাজারে বিভিন্ন নামী-দামী ব্র্যান্ড ও মার্কার আড়ালে চলছে ভেজাল ভূষি ও আটার রমরমা ব্যবসা। জনপ্রিয় একটি ব্র্যান্ড বা মার্কাকে নকল করে বাজারে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন রকমের ভুষি। তাছাড়া বাহিরের বিভিন্ন দেশ থেকে এলসি ভুষি ক্রয় করে নিয়ে এসে মেশানো হয় নিজেদের তৈরি ভুষির সাথে। যদিও ভুষির মেয়াদ থাকে মাত্র ৬০ দিন। তাহলে দেশের বাহিরের এলসি ভুষি আমদানি করতে যে দীর্ঘ সময় ব্যয় হয় এতে এলসি ভূষির গুণগত মান নিয়ে কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়। আর সেই ভূষিই যদি মেশানো হয় নিজেদের তৈরি ভূষিতে তাহলে গবাদি পশুর খাদ্য তালিকায় এই ভুষি রাখা কি আসলেই যৌক্তিক?
নীল কমল ফ্লাওয়ার মিলে গিয়ে দেখা যায়, মিলের পাঁচপেটি মেশিনে শুধুমাত্র তৈরি হচ্ছে ভুষি ও ময়দা। এখানে আটা বা সুজি তৈরী হচ্ছে না। এই মিলে বর্তমানে ৩৭ কেজির প্রতি বস্তা গমের ময়দা পাইকারী বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬৫০ টাকায়। এখানে উৎপাদিত ভূষির দুটি মার্কা দেওয়া হয়েছে। একটি পদ্মফুল এবং আরেকটি তিন বাদুর মার্কা। ‘পদ্মফুল মার্কা’ ৪০ কেজির প্রতি বস্তা ভূষি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ টাকায় এবং ‘তিন বাদুর মার্কা’ ভূষি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫৮০ টাকায়। এখানে জনপ্রিয় সিটি গ্রুপের তীর ব্রান্ডের ভুষিসহ অন্য কোম্পানির ভূষি দেখতে পাওয়া যায়।
সজিব ট্রেডার্স ফ্লাওয়ার মিল সাতগাড়ি পরিদর্শন করে দেখা যায়, কেনায়েত আলীর স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠানে বিগত দুই বছর ধরে এখানে শুধুমাত্র উৎপাদন করা হচ্ছে ‘ডালিম মার্কা’ ভূষি। প্রতিষ্ঠানটিতে মূলত গম ও আটার মিশ্রণে তৈরি ভূষি বিক্রি করা হয়। যার ৪০ কেজির বস্তার দাম ১ হাজার ৬০০ টাকা। এছাড়া একইদামে আমদানিকৃত ভূষিও বিক্রি হচ্ছে এখানে। এখানকার উৎপাদন প্রক্রিয়ায় দেখা যায় একটি মাত্র মেশিনে গম দিয়ে আটা মিশ্রণ করে তৈরি করা হচ্ছে এই ভুষি। এখানে গম থেকে ময়দা বা আটা তৈরী করা হয়না বলে জানা গেছে।
‘নিউ সততা ফ্লাওয়ার মিল’-এর স্বত্বাধিকারী সাদ্দাম হোসেন সুমন বলেন, দীর্ঘ ১২ বছর ধরে এই ব্যবসায় আছি, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসায় মারাত্মক লস (লোকসান) যাচ্ছে। পুরো চুয়াডাঙ্গা জুড়ে এখন শুধু সস্তা ও মানহীন ‘বাদুড় মার্কা’ ভূষির ছড়াছড়ি। প্রথমে একটি বাঁদুড় মার্কা জনপ্রিয় থাকলেও বর্তমানে বাজারে জোড়া বাদুড়, তিন বাদুড়, পাঁচ বাদুড়, সাত বাদুড় মার্কা ভুসিও বিক্রি হয়। অনেক নিম্নমানের ভূষির দামেও প্রতিযোগিতা হয়। তবে দামের ক্ষেত্রে নয় ভূষির গুণগত মানে প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, স্থানীয় প্রশাসনের এ ব্যাপারে কোনো ভ্রূক্ষেপ বা কার্যকর নজরদারি নেই। তিনি আরও জানান, তার মিলে বর্তমানে ৪০ কেজি ওজনের প্রতি বস্তা ভূষি ‘জোড়া বাদুড়’ মার্কা ১ হাজার ৫৮০ টাকা, ‘নিউট্রি ফার্ম’ ১ হাজার ৬৫০ টাকা এবং ‘রজনীগন্ধা’ ১ হাজার ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ৩৭ কেজির বস্তা ‘পাঁচরানী মার্কা’ আটা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২৮০ টাকায়। মাসে ৩ হাজার বস্তা ভূষি ও আটা বিক্রি করেন বলে জানান। পণ্যের স্থায়িত্ব সম্পর্কে তিনি বলেন, ভালো মানের ভূষির মেয়াদ থাকে ৬০ দিন এবং আটার মেয়াদ থাকে ৪৫ দিন।
চুয়াডাঙ্গার আলুকদিয়ার ইনসাফ ট্রেডাস ফ্লাওয়ার মিলে গিয়ে দেখা যায়, বিএসটিআই লাইসেন্স ব্যতীত এখানে তৈরি হচ্ছে গো-খাদ্য ভুষি। গম দিয়ে এখানে শুধুমাত্র তৈরি হচ্ছে চিকন ভুষি। ৪০ কেজির ১ বস্তা ভূষি  ১ হাজার ৫৮০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে বলে জানান। ইনসাফ ট্রেডার্স এর স্বত্বাধিকারী আবুল হাসান বলেন, আমি কিছুদিন যাবত এই ভুষি তৈরি শুরু করেছি তাই এখনো বিএসটিআই লাইসেন্স করা হয়নি। তবে বিএসটিআই লাইসেন্স করার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন আছে। এখানে কোন নিম্নমানের ভুষি তৈরি হয় না। আমরা মোজাম্বিক থেকে এলসি ভুষি নিয়ে এসে আমাদের তৈরিকৃত ভূষির সাথে মেশাই এতে গুণগত মান টা একটু ভালো হয়।
চুয়াডাঙ্গা রেলবাজারের ভুষিমাল বিক্রেতা ফরিদ হোসেন জানান, বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ভুষি পাওয়া যায়। তবে ফ্রেশ কোম্পানি, তীর কোম্পানি, সানসাইন কোম্পানির মতো নামকরা ব্র্যান্ডের ভুষিগুলো সব থেকে বেশি মানসম্পন্ন। চুয়াডাঙ্গায় নানা ব্র্যান্ডের ভুষি উৎপাদন হয়। কিছু কিছু ভূষি একদম পিওর হয় এবং কিছু ভূষিতে আটা মিশানো থাকে। বাজারে প্রতি কেজি ভূষির খুচরা মূল্য ৪৫ থেকে ৫০ টাকা।
স্থানীয় ডেইরি খামারিদের অভিযোগ, চুয়াডাঙ্গার কিছু মিলে গম ভাঙানোর সময় কৌশলে ভুসি ও আটার অনুপাত ঠিক না রেখে ধানের গুড়া মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমদানিকৃত নিম্নমানের এলসি ভূষির কারণেও খামারিরা প্রতারিত হচ্ছেন। এই ভেজাল খাদ্য খাওয়ার ফলে দুগ্ধজাত গাভী ও মোটাতাজাকরণ গরুর পুষ্টিহীনতা দেখা দিচ্ছে।  
বাজারের এই অরাজকতা ও ভেজাল রোধে মিল মালিকরা দুটি বিষয় উল্লেখ করেছেন। ভেজাল প্রতিরোধে ও খাদ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করতে অবিলম্বে মিল মালিকদের একটি শক্তিশালী মনিটরিং কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। বাজার থেকে নিম্নমানের ও মেয়াদোত্তীর্ণ এলসি ভূষি আসা বন্ধ করা হলে গবাদিপশুর রোগবালাই অনেকাংশে কমে যাবে। দেশীয় মিলগুলো সঠিক মূল্যে মানসম্মত খাদ্য সরবরাহ করতে পারবে।
এ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের চুয়াডাঙ্গা জেলা কার্যালয়ে সহকারী পরিচালক মামুনুল হাসান বলেন, সম্প্রতি জীবননগরে ভেজাল ভূষি তৈরি করে তীর ব্র্যান্ডিং করায় তাদেরকে আমরা এক লাখ টাকা জরিমানা করেছি। কোন মিল মালিক যদি ভেজাল ভূষি তৈরি করে বা নিজের তৈরি ভুষি অন্য নামিদামি ব্র্যান্ডিং করে বিক্রি করে তাহলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সাহাবুদ্দিন জানান, গবাদিপশুর দৈহিক ওজনের ১% দানা জাতীয় খাদ্য এবং ৫-১০% আঁশ জাতীয় খাদ্য খাওয়ানো প্রয়োজন। দানা জাতীয় খাদ্যে শর্করা ৫০ শতাংশ, খৈল জাতীয় ২০ শতাংশ, ডাল বা শস্য জাতীয় ২০ শতাংশ, ৫ শতাংশ খনিজ এবং ৫% ভিটামিন থাকতে হবে। তাহলে এটি গবাদিপশুর জন্য একটি সুষম খাদ্যে পরিণত হবে।
ভেজাল ভূষির ভয়াবহ দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, ভেজাল ভূষি কোন ভাবেই গরু বা ছাগলকে খাওয়ানো যাবে না। যদি কোন অসাধুচক্র ভেজাল ভূষি তৈরি করে তা প্রতিরোধে অবশ্যই বাজার মনিটরিং করা প্রয়োজন। গরু বা ছাগলকে ভেজাল ভূষি খাওয়ালে পশুর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটবে। বদহজম, পাতলা পায়খানা, পানি শূন্যতার মতো রোগে আক্রান্ত হবে পশু। সেই সাথে গরুর স্বাস্থ্যের ব্যাপক ক্ষতিসাধন হবে। তাই গরুকে সুস্থ রাখতে সঠিক পরিমাণ ফাইবার সমৃদ্ধ খাদ্য সরবরাহ করা প্রয়োজন।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।