সাইদুর রহমান, দামুড়হুদা
দামুড়হুদা উপজেলার নাটুদহ অঞ্চলের জমিদার নফর পাল চৌধুরীর স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক স্থাপনা ও কীর্তিগুলো আজ ধ্বংসের পথে। কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে জমিদার মহলের জৌলুস, খাজনা আদায়ের লাঠিয়াল বাহিনী, পাইক-পেয়াদা, বরকন্দাজ, চাকর-বাকর, ঘোড়াশাল এবং সুবিশাল অট্টালিকা। তবে সবকিছু বিলীন হলেও আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জমিদার বাড়ির প্রবেশদ্বারে স্থাপিত দুটি প্রাচীন মন্দিরসদৃশ প্রধান ফটক।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে লর্ড কর্নওয়ালিশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা চালুর সময় ভারতের ২৪ পরগনার প্রভাবশালী ব্যক্তি শ্রী মধুসূদন পালের একমাত্র সন্তান শ্রী নফর পাল চৌধুরী নাটুদহ, কার্পাসডাঙ্গা, হাতাবাড়ি, মেমনগর, বাগোয়ান ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা বন্দোবস্ত নেন। পরে নাটুদহকে সদর স্টেট ঘোষণা করে জমিদারি কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
জমিদার নফর পাল চৌধুরী ছিলেন প্রজাহিতৈষী, শিক্ষিত ও উদার মনের মানুষ। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল প্রজার প্রতি সমান আচরণ করতেন তিনি। সে সময় এলাকায় হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের লোকজনই জমিদার মহলের বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।
নাটুদহ সদরে অবস্থিত জমিদার বাড়িটি ছিল চারদিক প্রাচীরবেষ্টিত চারতলা বিশিষ্ট সুবিশাল ভবন। সামনে ছিল সিংহচিহ্নখচিত মনোরম প্রধান ফটক। পাশেই ছিল দুটি বড় মন্দির। ভবনের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল গোপন পথ ও সিঁড়িযুক্ত পুকুর, যেখানে জমিদার পরিবারের সদস্যরা স্নান করতেন। এছাড়া ছিল প্রজাদের জন্য আমবাগান, জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য পাকা ঘাটওয়ালা বিশাল পুকুর, ঘোড়াশাল, ঘোড়া গোসলের আলাদা পুকুর, পোস্ট অফিস ও দরিদ্রদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র।
জানা যায়, জমিদারের ছোট ছেলে ক্ষিতিশ চন্দ্র পাল উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডনে গিয়ে টেমস নদীর তীরে একটি অট্টালিকা দেখে মুগ্ধ হন। পরে তার অনুরোধে বোয়ালমারী ও জগন্নাথপুরের মাঝামাঝি ভৈরব নদীর তীরে অনুরূপ একটি তিনতলা ভবন নির্মাণ করেন নফর পাল চৌধুরী, যা স্থানীয়ভাবে ‘হাওয়া ভবন’ নামে পরিচিত ছিল।
১৯৩৫ সালের শেষদিকে নফর পাল চৌধুরীর মৃত্যু হলে জমিদারি তিন ছেলের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে দেশভাগ ও জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর বড় ছেলে সতীশ চন্দ্র পাল তার সম্পত্তির বড় অংশ প্রজাদের মধ্যে বণ্টন করে ভারতে চলে যান।
এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জমিদার পরিবারের অধিকাংশ স্থাপনা স্থানীয় একশ্রেণির প্রভাবশালী ব্যক্তি ভেঙে বিক্রি করে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে বিলীন হয়ে যায় নাটুদহ স্টেট, হাওয়া ভবনসহ বহু ঐতিহাসিক স্থাপনা।
তবে এখনো জমিদার বাড়ির দুটি প্রাচীন ফটক-মন্দির মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, যা নাটুদহ অঞ্চলের হারানো ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী হয়ে ইতিহাসের স্মৃতি বহন করে চলেছে।
ধ্বংসের মুখে নাটুদহের জমিদার নফর পাল চৌধুরীর ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা



