চুয়াডাঙ্গায় জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায় জেলার প্রশাসক লুৎফুন নাহার

স্টাফ রিপোর্টার
চুয়াডাঙ্গায় জেলা উন্নয়ন কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল রবিবার সকাল ১০টায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার। সভা সঞ্চালনা করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব ও সার্বিক) নয়ন কুমার রাজবংশী। সভায় গত মাসের কার্যবিবরণী উপস্থাপন করেন জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার আশফাকুর রহমান।
সভায় চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাসুদুর রহমান সরকার বলেন, জেলায় বর্তমানে প্রায় ৮০ শতাংশ ধান পেকে গেছে। সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাতের কারণে সেচের তেমন কোনো সমস্যা নেই। চুয়াডাঙ্গা সদর ও আলমডাঙ্গায় শনিবার উল্লেখযোগ্য হারে বৃষ্টি হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার জীবননগরে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ ধান পেকে গেছে এবং সেচের প্রয়োজন নেই। পাটের অবস্থাও ভালো। প্রায় এক ফুট পর্যন্ত বেড়ে ওঠায় সেখানে সেচের কোনো ঝামেলা নেই। বর্তমানে মাঠে পাট ছাড়া সার প্রয়োগের মতো অন্য কোনো ফসল নেই। ফলে সার ও জ্বালানি নিয়ে সংকটের আশঙ্কা নেই। তবে ১০ থেকে ১২ দিন পর ধান মাড়াইয়ের সময় কিছুটা ডিজেলের চাহিদা বাড়তে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন এবং এ বিষয়ে সরকারের প্রস্তুতি থাকার কথাও জানান।
চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়া উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, দেশে বর্তমানে হামের প্রকোপ বাড়ছে, যা জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। তবে চুয়াডাঙ্গার পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো। সদর হাসপাতালে এ পর্যন্ত হাম উপসর্গ নিয়ে ৪২ জন ভর্তি হয়েছিল, শনিবার পর্যন্ত ভর্তি ছিল ৬ জন; বাকিরা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। জেলায় হাম আক্রান্ত হয়ে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। ভর্তি হওয়া ৪২ জনের মধ্যে ৩৩ জনের নমুনা ঢাকায় পাঠানো হলেও কোনো পজিটিভ পাওয়া যায়নি। তিনি আরোও জানান, সোমবার জেলা প্রশাসক হামের টিকাদান ক্যাম্পেইনের উদ্বোধন করবেন। ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের এক ডোজ টিকা দেয়া হবে। জেলার ৮৯৬টি ইপিআই কেন্দ্রে এ কার্যক্রম চলবে ১০ মে পর্যন্ত। কমিউনিটিতে ৮ কর্মদিবস এবং স্কুলে ৩ কর্মদিবস টিকাদান কার্যক্রম চলবে। এ কার্যক্রম সফল করতে সবাইকে তথ্যটি প্রচারের আহ্বান জানান তিনি।
জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুকুল কুমার মৈত্র জানান, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতি বছর জেলায় ৫০০টি করে গাছ রোপণ করতে হবে, যা পাঁচ বছরে দাঁড়াবে ২ হাজার ৫০০টি। জেলা প্রশাসকের নির্দেশনা অনুযায়ী এ সংখ্যা আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। জেলা পরিষদের আওতাধীন সড়কগুলোতে ইতোমধ্যে গাছ লাগানো হয়েছে। যেসব গাছ মারা গেছে, সেখানে নতুন করে রোপণ করা হবে। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা সরকারি জায়গায় স্থান থাকলে চাহিদা অনুযায়ী গাছ লাগানোর প্রকল্প নেয়া যাবে। ঝড়ে পড়ে যাওয়া গাছ দ্রুত অপসারণে গাছ কাটার মেশিন কেনা হয়েছে বলেও তিনি জানান। এছাড়া পূর্বে কর্তিত গাছগুলো উপজেলা ডাকবাংলোয় সংরক্ষিত আছে এবং বন বিভাগের মূল্য নির্ধারণের পর পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিলাম আয়োজন করা হবে।
গাছ লাগানোর বিষয়ে জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার বলেন, বছরে ৫০০ গাছ লাগানোর সীমা বাড়াতে হবে। চুয়াডাঙ্গার আবহাওয়া সহনীয় রাখতে ব্যাপক বনায়নের বিকল্প নেই। জেলা পরিষদসহ পানি উন্নয়ন বোর্ড, বন বিভাগ ও ত্রাণ-পুনর্বাসন দপ্তরকে সমন্বিতভাবে বনায়ন কার্যক্রম জোরদার করার নির্দেশ দেন তিনি। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত জমিতেও গাছ লাগাতে সবাইকে উৎসাহিত করেন। তিনি আরও বলেন, জেলা পরিষদের কর্তন করা গাছ নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে।
চুয়াডাঙ্গা পৌর প্রশাসক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক শারমিন আক্তার বলেন, পৌর এলাকার ১২টি স্পটে পরিচ্ছন্নতা ও ড্রেন পরিষ্কারের কাজ শেষে মশক নিধনে স্প্রে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ২৫ মার্চ থেকে এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যেখানে এমপি, জেলা প্রশাসন, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন এবং সাংবাদিকরা অংশ নিয়েছেন। হাসপাতাল এলাকায় ইতোমধ্যে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। তিনি জানান, মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে প্রতি শনিবার বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি পালনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে এবং সে অনুযায়ী নিয়মিত অভিযান চলছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও ঝোপঝাড় পরিষ্কারে গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান জানান তিনি। এছাড়া অতিরিক্ত ময়লা জমলে পৌরসভাকে জানালে তা অপসারণে ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রাণিসম্পদ ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় পৌরসভার নতুন বাজারে ৮টি দোকান নির্মাণ করা হলেও এ বিষয়ে পৌরসভা কোনো তথ্য পায়নি। দোকানগুলোর প্রকল্প ব্যয়, নকশা বা বরাদ্দ নীতিমালা সম্পর্কে অজ্ঞাত থাকার কারণে সেগুলো বন্ধ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার কাজ শেষে চলে যাওয়ার পরও বিষয়টি অনিষ্পন্ন রয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকেও স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে তিনি জানান।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, পৌরসভার জমিতে কোনো স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে অবশ্যই অনুমোদন নিতে হবে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও পৌরসভা যৌথভাবে বসে বিষয়টি সমাধান করবে। সাত দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জনগণের অর্থে নির্মিত দোকান কীভাবে বরাদ্দ দেয়া হবে, তা নিয়মের মধ্যে থেকেই নির্ধারণ করতে হবে বলেও তিনি নির্দেশ দেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফ আহমেদ বলেন, তাদের অধিগ্রহণকৃত জমিতে সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি চলমান রয়েছে। তবে জনবল সংকট থাকায় রোপণ ও পরিচর্যায় সমস্যা হচ্ছে। সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করা গেলে এ সমস্যা কাটানো সম্ভব। তিনি জানান, খালখনন কাজে প্রতিদিন স্কেভেটর পরিচালনার জন্য ডিজেল প্রয়োজন, কিন্তু জ্বালানি সংকটে কিছুটা বিঘ্ন ঘটছে।
উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায় আরোও উপস্থিত ছিলেন সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আমিনুল ইসলাম, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) শাহিনুর ইসলাম, জেলা মৎস্য অফিসের সিনিয়র সহকারী পরিচালক সরোজ কুমার, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সাহাবুদ্দিন, সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক বিদ্যুত কুমার বিশ্বাস, সড়ক ও জনপদ বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী কাজল মিয়া, এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী আসানুল হক, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম, ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীব, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল কাদের, বিআরডিবির উপপরিচালক জাকিরুল ইসলাম, সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক জাকির হোসেন, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক দীপক কুমার সাহা, জেলা শিক্ষা অফিসার জেসমিন আরা খাতুন, প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার অহীন্দ্র কুমার মন্ডল, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক ফিরোজ আহমেদ, জেলা পরিসংখ্যান অফিসের উপপরিচালক মুহাম্মদ ওয়ালিউর রহমান, জেলা নির্বাচন অফিসার আহমেদ আলী, চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সাধারন সম্পাদক শাহ আলম সনিসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।