কয়রাডাঙ্গায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুজ্জামান লাল্টুর দাফন সম্পন্ন

স্টাফ রিপোর্টার
চুয়াডাঙ্গার কয়রাডাঙ্গা গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুজ্জামান লাল্টুকে(৭৭) নামাজে জানাজা শেষে দাফন করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় আলমডাঙ্গা উপজেলার কয়রাডাঙ্গা নিজ গ্রামে  জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়। এর আগে ফুটবল মাঠে তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।
দাফন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আলমডাঙ্গা উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) এ এস এম শাহনেওয়াজ মেহেদী। এ সময় আলমডাঙ্গা থানা পুলিশের একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার প্রদান করেন। বিউগলের করুণ সুরে ও জাতীয় পতাকায় আচ্ছাদিত মরদেহে ফুল দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান প্রশাসনের কর্মকর্তা, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। হাফেজ জুনায়েদ আল হাবিব বিশ্বাসের পরিচালনায় মরহুমের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। নামাজে জানাজা শেষে কয়রাডাঙ্গা হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও মসজিদ সংলগ্ন কবরস্থানে দাফনসম্পন্ন করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে নুরুজ্জামান লাল্টু নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির আঞ্চলিক শীর্ষ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি সবকিছু ছেড়ে সাধারণ মানুষের সাথে স্বাভাবিক জীবন যাপন শুরু করেন। রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা সত্ত্বেও এলাকায় তিনি একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা ও স্পষ্টভাষী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়লে কয়রাডাঙ্গা ও আশপাশের এলাকা থেকে হাজারো মানুষ তাকে শেষ বারের মত দেখতে ফুটবল মাঠে ভিড় জমায়। জানাজায় অংশ নেন বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ।
১৯৭৫ সালের ৩০ মে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার নুরুল্লাপুর গ্রাম থেকে নুরুজ্জামান নান্টু (লাল্টু)  তার ৯ সহযোগীসহ গ্রেপ্তার হয়। প্রায় ৯ বছর পর লাল্টু মুক্তি পায় ১৯৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। এরপর লাল্টু স্বাভাবিক জীবনে থাকার চেষ্টা করে। জীবিকার প্রয়োজনে পশু বেচাকেনাসহ  স্থানীয় গোকুলখালী বাজারে আড়তদারি ব্যবসাতে নিয়োজিত হয়। গ্রামবাসীর মতে, এ সময় সে তীব্র হতাশায় ভুগছিলেন। আর্থিক সংকটে কাটছিল তার দিন। এছাড়া ওই অঞ্চলে গোপন কিছু সশস্ত্র গ্রুপের কারণে তার জীবনযাপনও ছিল হুমকির মুখে। ১৯৮৭ সালে আলমডাঙ্গা থানা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার নির্বাচিত হন নুরুজ্জামান  লাল্টু।
তৎকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সাধারণ ক্ষমার ঘোষণায় ১৯৯৯ সালের ২৯ জুলাই লাল্টু খুলনার তৎকালীন ডিআইজি লুৎফুল কবিরের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করে। আত্মসমর্পণ করে ১৯ বছর জেল খাটেন। যার মামলা সংখ্যা ছিল ২৬ টিরও বেশি। ২০১৮ সালের ১২ ই ফেব্রুয়ারি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে  জেলগেটে সাংবাদিকদের নিকট  স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে নিজের অপরাধবোধের কথা স্বীকার করেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বিভিন্ন মার্ডার কেস,হ্যানো তেনো সাত-১৭ মিলে দৃষ্টিরও বেশি মামলায় ১৯ বছর জেল খাটলাম। এখন আমি ফিরে যাবো আমার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কৃষি কাজে।
নুরুজ্জামান লালটুর বিরুদ্ধে সবচাইতে আলোচিত মামলা ছিল বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী আরিফ হত্যা মামলা। এ মামলা বিষয়ে নুরুজ্জামান লালটু বলেছিলেন, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা  হয়ে আর একজন মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করতে পারি না। তাছাড়া সন্ত্রাস ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে  প্রতিরোধই আমার লক্ষ্য ছিল। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কারাগার থেকে বের হয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে শুরু করেন তিনি । চুয়াডাঙ্গা আলমডাঙ্গা উপজেলার কয়রাডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা লাল্টু এলাকায় আস্তে আস্তে  জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন তার বেশ কিছু সামাজিক কাজের মধ্য দিয়ে।  

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।