আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য নরসুন্দর পেশা চার দশক ধরে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন অজিত কুমার বিশ্বাস

হাটবোয়ালিয়া প্রতিনিধি
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক সেলুন ও জেন্টস পারলারের প্রসার ঘটলেও গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নাপিত পেশা এখন বিলুপ্তির পথে। চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় একসময় ইট কিংবা কাঠের পিঁড়ির ওপর বসিয়ে চুল-দাড়ি কাটার দৃশ্য ছিল খুবই পরিচিত। আশি ও নব্বইয়ের দশকে জেলা শহর, আলমডাঙ্গা উপজেলা শহর, আসমানখালী বাজার ও হাটবোয়ালিয়াসহ বিভিন্ন হাট-বাজারে নাপিতেরা ঘুরে ঘুরে এই সেবা দিতেন।
সে সময় প্রতি মাথা চুল কাটার মূল্য ছিল মাত্র ৩ থেকে ৫ টাকা। অনেক ক্ষেত্রে নগদ অর্থের পরিবর্তে ধান, গম কিংবা মশুর ডাল নিয়েই মজুরি পরিশোধ করা হতো। কৃষিনির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে এই পেশার ছিল নিবিড় সম্পর্ক।
কালের বিবর্তনে আধুনিকতার ছোঁয়ায় ঐতিহ্যবাহী এ পেশা আর আগের মতো লাভজনক নেই। ফলে অনেকেই পেশা বদলেছেন। তবে বংশপরম্পরায় পাওয়া ঐতিহ্য ধরে রাখতে এখনও লড়াই করে যাচ্ছেন কেউ কেউ। তেমনই একজন শ্রী অজিত কুমার বিশ্বাস।
তিনি আলমডাঙ্গা উপজেলার হাটবোয়ালিয়া গ্রামের একজন পেশাদার নাপিত। প্রায় চার দশক ধরে কাঠের পিঁড়ির ওপর বসিয়ে চুল-দাড়ি কাটার ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখেছেন তিনি। তার বাড়ি আমতৈল গ্রাম, গাংনী উপজেলা, মেহেরপুর জেলা। জীবিকার তাগিদে তিনি বিভিন্ন গ্রামের হাট-বাজারে ঘুরে এ সেবা দিয়ে আসছেন।
অজিত কুমার বিশ্বাস বলেন, এ পেশা খুব বেশি লাভজনক না হলেও বংশীয় ঐতিহ্য রক্ষার জন্য আমি এখনো কাঠের পিঁড়ির ওপর বসিয়ে চুল-দাড়ি কাটাই। আমরা যদি পুরোপুরি আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে যাই, তাহলে আশি-নব্বই দশকের এই ঐতিহ্য একেবারেই হারিয়ে যাবে।
তিনি আরও জানান, হাটবোয়ালিয়াসহ বিভিন্ন বাজারে আয় সীমিত হলেও এই সামান্য উপার্জনেই কোনোমতে সংসার চলে।
হাটবোয়ালিয়া গ্রামের বাসিন্দা মুর্শিদ কলিন বলেন, সভ্যতার বিবর্তনে মানবজীবনে যেমন পরিবর্তন এসেছে, তেমনি হাট-বাজারের পিঁড়িতে বসা সেলুনও হারিয়ে যাচ্ছে। নামীদামি সেলুন ও আধুনিক হেয়ার স্টাইলের ভিড়ে গ্রামবাংলার সেই পরিচিত দৃশ্য এখন আর সচরাচর চোখে পড়ে না।
যুগ বদলের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা, রুচি ও পেশায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। তবুও গ্রামাঞ্চলের সাপ্তাহিক হাট-বাজারগুলোতে এখনো দেখা মেলে ভ্রাম্যমাণ নাপিতদের কর্মব্যস্ততা। ঐতিহ্য আর আধুনিকতার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে অজিত কুমার বিশ্বাসদের মতো মানুষই স্মরণ করিয়ে দেন গ্রামীণ সংস্কৃতির শিকড় এখনো পুরোপুরি শুকিয়ে যায়নি।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।