গুড়া মসলা ও জিও ব্যাগ তৈরী করে সফলতা পাচ্ছেন চুয়াডাঙ্গার নারী উদ্যোক্তা পিংকি

মুন্না রহমান, স্টাফ রিপোর্টার
নারী উদ্যোক্তা মরিয়ম আক্তার পিংকি। তিনি নিজ হাতে বিভিন্ন ধরনের গুড়া মসলা ও জিও ব্যাগ তৈরী করে সফলতা পাচ্ছেন। মাত্র ৫০ হাজার টাকা দিয়ে এ ব্যবসায় তার হাতে খড়ি। বর্তমানে চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন দোকানে পিংকির তৈরী গুড়া মসলা বিক্রি করা হচ্ছে। সেইসাথে অনেকে বাসা বাড়ির ছাদে জিও ব্যাগ নানান প্রজাতির গাছ লাগানোর কাজে ব্যবহ্রত হচ্ছে।
সংসারের চাকা ঘোরানোর পাশাপাশি নিজের একটি আলাদা পরিচয়ের স্বপ্ন দেখতেন চুয়াডাঙ্গার পলাশ পাড়ার মরিয়ম আক্তার পিংকি (৩৩)। আজ তিনি শুধু একজন সাধারণ গৃহিণী নন। তিনি একজন সফল নারী উদ্যোক্তা। নিজের মেধা, পরিশ্রম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে পুঁজি করে তিনি গড়ে তুলেছেন ‘এইচ এম এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠান। তাঁর তৈরি হোমমেড মসলা ও জিও ব্যাগ এখন স্থানীয় পর্যায়ে সাড়া ফেলছে।
শহর থেকে ১২ কিলোমিটার দুরে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার ধুতুরহাট গ্রামে বেড়ে ওঠা মরিয়ম আক্তার পিংকি। তার পিতার নাম মোঃ আয়নাল হক। দুই বোন এক ভাইয়ের মধ্যে তিনিই বড়। বৈবাহিক সূত্রে বর্তমানে তিনি চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার পলাশপাড়ার বাসিন্দা। তার দুটি কন্যা সন্তান রয়েছে। মরিয়ম আক্তার পিংকি ধুতুরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ৫ম শ্রেনী পাশ করেন। এরপর সরোজগঞ্জ ছাদেমান নেছা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। পরে বদরগঞ্জ ডিগ্রী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ফরিদপুর গ্লোবাল হেলথ কেয়ার থেকে তিনি ডিএমএফ কোর্স করেন। পরে চুয়াডাঙ্গার হোপ হেলথ কেয়ার থেকে এল এম এফ কোর্স সম্পন্ন করেন। দীর্ঘদিন চুয়াডাঙ্গায় ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পেইনে মানবসেবায় নিয়োজিত ছিলেন। পরে নিজ উদ্যোগে এবং পরিবারের স্বজনদের অনুপ্রেরণায় উদ্যোক্তা হওয়ার পথে পা বাড়ান।
শুরুতে এই পথচলাটা খুব সহজ ছিল না। মানুষের দোরগোড়ায় খাঁটি ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পৌঁছে দেওয়ার তাগিদ থেকেই তিনি হোমমেড মসলা তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। ২০২৫ সালের ১০ই মার্চ এইচ.এম এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। বিএসটিআই অনুমোদিত হোমমেড মসলা এবং জিও ব্যাগ তৈরি করেন ঘরোয়া উপায়ে। বর্তমানে তার কারখানায় তিনিসহ ৪ জন কর্মরত রয়েছেন। শহরের পলাশ পাড়ায় প্রায় ২ হাজার বর্গফুটের অফিসের মধ্যে গড়ে তুলেছেন মসলা তৈরী প্রতিষ্ঠান।
আলাপ চারিতায় মরিয়ম আক্তার পিংকি বলেন, ৫০ হাজার টাকা দিয়ে আমার এ ব্যবসা শুরু। দেড় বছরের ব্যবধানে বর্তমানে আমার ব্যবসার পুজি দাড়িয়েছে ৭ লাখ টাকা।  প্রতিদিন সকল প্রকার মসলা ও জিও ব্যাগ মিলিয়ে ৭ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি হয়। সেই হিসাবে মাসে প্রায় ২ লাখ লাখ বেচাকেনা হয়। প্রতি কেজি হলুদ গুড়া ৩০০ টাকা, ধনিয়া গুড়া ৩০০ টাকা, মরিচ গুড়া ৫০০ টাকা এবং জিরা গুড়া ৯০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
আমি সবসময় চাইতাম নিজের পায়ে দাঁড়াতে। রান্নায় আমরা প্রতিনিয়ত যে মসলা ব্যবহার করি, তাতে নানা রকম ভেজালের খবর পাই। তাই মসলা তৈরী করার কথা ভাবলাম। সেই ভাবনা থেকেই এইচ এম এন্টারপ্রাইজের যাত্রা। শুরুতে কাউকে পাশে না পেলেও নিজের পরিবার এবং একজন স্যারের অনুপ্রেরণায় আজকে আমি এতদূর। বিভিন্ন জায়গায় আমি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নানান রকমের প্রশিক্ষণ নিয়েছি। প্রশিক্ষণ শেষে বিএসটিআই অনুমোদন নিয়ে ঘরোয়াভাবে সকল পণ্য তৈরি করছি। মরিয়মের প্রতিষ্ঠানের মূল আকর্ষণ দুটি ভিন্নধর্মী পণ্য। হোমমেড মসলার মধ্যে মরিচ, হলুদ, ধনে, জিরা থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রকার গরম মসলা নিজে ধুয়ে, শুকিয়ে এবং ভাঙিয়ে প্যাকেটজাত করেন তিনি। কোনো প্রকার কৃত্রিম রঙ ব্যবহার না করায় বাজারে এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
হোমমেড মসলার পাশাপাশি তিনি পরিবেশ রক্ষায় ও ছাদ বাগানিদের সুবিধার্থে তৈরি করছেন জিও ব্যাগ (এবড় ইধম)। গাছ লাগানো এবং মাটিক্ষয় রোধে এই ব্যাগের ব্যবহার এখন বেশ জনপ্রিয়। ঘরোয়া প্রযুক্তিতে তৈরি এই ব্যাগগুলো টেকসই ও সাশ্রয়ী হওয়ায় চুয়াডাঙ্গার ছাদ বাগান প্রেমীদের কাছে এটি পরিচিতি লাভ করেছে। শুরুতে মূলধন ও বিপণন নিয়ে কিছু চ্যালেঞ্জ ছিলো। তবে পিংকি নিজ প্রচেষ্টায় সব বাধা দূর করেছে। অনলাইনের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবেও এখন তাঁর পণ্যের বেশ কদর। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে জানতে চাইলে এই উদ্যোক্তা জানান, তিনি তাঁর ‘এইচ এম এন্টারপ্রাইজ’কে আরও বড় করতে চান। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বাইরের জেলাতে তার মসলা পৌছে দিতে চান।
মসলা কারখানায় কর্মরত রাজিয়া খাতুন বলেন, এক বছর হল আমি এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করছি। আমি এখানে মসলা প্যাকেট করি এবং জিও ব্যাগ তৈরি করি। এ সকল কাজের দক্ষতা রপ্ত করে ভবিষ্যতে আমি উদ্যোক্তা হতে চাই। মাসে আমি বেতন পাই ৫ হাজার টাকা।
আরেক কর্মী রত্না আক্তার বলেন, এখানে হলুদ, মরিচ, ধনিয়া ও জিরা গুড়াগুলো আমি প্যাকেট করি। আড়াইশো গ্রামের জার থেকে শুরু করে ১ কেজি ও ২ কেজি পর্যন্ত প্যাকেট করা হয়। এ প্যাকেটগুলো আমাদের আরেক সহকর্মি রিমন বিভিন্ন দোকানে সাপ্লাই দেই।  

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।