স্বামীর দেওয়া ৭০ শতক জমি হারিয়ে ঝুপড়িঘরে ৯০ বছরের সন্ধ্যা রানী

নাজমুল হক শাওন আলমডাঙ্গা:

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও যেন অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে আলমডাঙ্গা উপজেলার বেলগাছি পালপাড়ার ৯০ বছর বয়সী অসহায় বৃদ্ধা সন্ধ্যা রানীর। স্বামীর মৃত্যুর আগে নিজের নামে রেজিস্ট্রি করে দেওয়া ৭০ শতক জমি এখন আর তার নামে নেই—এমন অভিযোগ নিয়ে একটি জরাজীর্ণ ঝুপড়িঘরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি।

স্বামী-সন্তানহারা এই বৃদ্ধার দাবি, জীবনে কখনো কোনো জমি বিক্রি করেননি, কাউকে রেজিস্ট্রিও দেননি। অথচ তার নামে থাকা জমি একাধিক হাত ঘুরে অন্যের নামে খারিজ হয়ে গেছে। বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা চলমান থাকলেও এখনও নিজের জমি ফিরে পাননি তিনি।

স্থানীয় সূত্র ও ভূমি-সংক্রান্ত নথিপত্র ঘেঁটে জানা যায়, বেলগাছি গ্রামের নিতাই পাল ১৯৮২ সালে স্ত্রী সন্ধ্যা রানীর নামে ৭০ শতক জমি রেজিস্ট্রি করে দেন। কয়েক বছর পর, ১৯৮৫ সালের দিকে নিতাই পাল মারা যান। এরপর দীর্ঘদিন ধরে সন্ধ্যা রানী ওই জমির খাজনা পরিশোধ করে আসছিলেন। সর্বশেষ ২০১৩ সালে তিনি খাজনা দেন।

কিন্তু ২০১৭ সালে পুনরায় খাজনা দিতে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গেলে তিনি জানতে পারেন, জমিটি আর তার নামে নেই। পরে খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন, একই গ্রামের গিয়াস উদ্দিনের ছেলে সাইফুল ইসলাম ২০১৭ সালের ১০ অক্টোবর তার বোন রুশিয়া খাতুনের কাছ থেকে জমিটি রেজিস্ট্রি করে নিয়েছেন।

এখানেই দেখা দেয় রহস্য। দলিলপত্রে উল্লেখ রয়েছে, রুশিয়া খাতুন নিতাই পালের কাছ থেকে ১৯৭৫ সালে জমিটি ক্রয় করেছিলেন। অথচ রুশিয়া খাতুন নিজেই দাবি করেন, তার প্রকৃত জন্ম ১৯৭৫ সালে। যদিও জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্মসাল ১৯৬৫ উল্লেখ রয়েছে। ফলে যে সময়ে তাকে জমির ক্রেতা দেখানো হয়েছে, সে সময় তার বয়স ও পরিচয় নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

রুশিয়া খাতুন বলেন, এই জমির বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। আমি কোনো জমি কিনিনি। আমার প্রকৃত জন্ম ১৯৭৫ সালে। জাতীয় পরিচয়পত্রে ভুলবশত ১৯৬৫ লেখা আছে।

তার ছেলে বলেন, আগে কী হয়েছে, তা আমি জানি না। তবে বিষয়টি আলোচনায় আসার পর জানতে পারি, আমার মায়ের নামে জমি ছিল। কীভাবে হয়েছে, সেটাও বলতে পারব না। সন্ধ্যা রানীর মতো একজন অসহায় বৃদ্ধার সঙ্গে এমন ঘটনা হওয়া উচিত হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, পরে সাইফুল ইসলাম নিজের নামে জমিটি খারিজ করে নেন। এরপর ২০২০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তিনি জমিটি পোয়ামারি গ্রামের হেলাল উদ্দিনের ছেলে মজনু ওরফে ঝান্টুর কাছে বিক্রি করেন।

এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে সন্ধ্যা রানী ২০২২ সালে আদালতে একটি পিটিশন মামলা দায়ের করেন। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।

মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে ২০২৫ সালে আলমডাঙ্গা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আশীষ কুমার বসুর কাছে তদন্ত প্রতিবেদন চাওয়া হয়। তিনি আলমডাঙ্গা পৌর ও বেলগাছি ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা রেজাউল ইসলামকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন। অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদনে রুশিয়া খাতুন, সাইফুল ইসলাম ও মজনুর পক্ষে মতামত দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় এক যুবক জানান, বৃদ্ধার দুর্দশা দেখে গ্রামের কয়েকজন যুবক তার জন্য একটি ঘর ও একটি টিউবওয়েল নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সাইফুল ইসলাম ও মজনুর লোকজন এতে বাধা দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এলাকাবাসী আরো জানান, স্বামীর মৃত্যুর পর থেকেই সন্ধ্যা রানী একটি ছোট ঝুপড়িঘরে বসবাস করছেন। তার দেখভাল করার মতো কেউ নেই। এখন কেউ তার পক্ষে কথা বলতেও ভয় পায়।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে সন্ধ্যা রানী বলেন, আমার ছেলে-মেয়ে কেউ  নেই। স্বামী মারা যাওয়ার আগে ৭০ শতক জমি আমার নামে লিখে দিয়েছিল। সেই জমির এক কোণে ঝুপড়ি তুলে থাকি। মানুষের বাড়িতে চেয়ে-চিন্তে খেয়ে দিন কাটাই। এখন নিজের নামের জমিও নেই।

তিনি আরও বলেন, আমি কোনো দিন রেজিস্ট্রি অফিসে যাইনি, কাউকে জমি লিখেও দিইনি। যারা আমাকে ভূমি অফিসে নিয়ে যায়, তাদের নামেও মামলা করা হয়েছে। মামলার ভয়ে এখন কেউ আমার পাশে দাঁড়াতে চায় না।

একদিকে জমি হারানোর অভিযোগ, অন্যদিকে চরম অসহায়ত্ব—সব মিলিয়ে সন্ধ্যা রানীর জীবন এখন যেন ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় থমকে আছে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই বৃদ্ধা এখনও আশা করেন, একদিন হয়তো সত্য প্রকাশ পাবে, আর তিনি ফিরে পাবেন স্বামীর রেখে যাওয়া শেষ সম্বলটুকু।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।