————কৃষিবিদ মনিরুজ্জামান বাবুল
বাবা দিবস! বাবা মা দিবস যদিও কোনো বিশেষ দিনক্ষণে সীমাবদ্ধ হয়না, তবুও প্রচলিত রীতিতে, ২১ জুন বিশ্ব বাবা দিবস প্রতিপালিত হয়ে আসছে। বাবা বলতেই মনের গহীনের একটি বিখ্যাত গান টি নব্বই দশকের প্রজন্মের হৃৎস্পন্দনের অনুভূতি বাড়ায়ে দেয়। নগর বাউল খ্যাত জেমস “বাবা! কতদিন, কতদিন! দেখিনা তোমায়…”—জনপ্রিয় এই গানের কথাগুলো শুধু একজন পিতৃহারা সন্তানের আর্তনাদ নয়; এটি পৃথিবীর অসংখ্য মানুষের হৃদয়ের গভীর অনুভূতির প্রতিধ্বনি। বাবা হারানোর শূন্যতা কখনো পূরণ হয় না; জীবনের প্রতিটি সাফল্য, সংকট ও আনন্দের মুহূর্তে তাঁর অভাব নতুন করে অনুভূত হয়।
বাংলা সমাজে একটি বহুল প্রচলিত কথা আছে—”পৃথিবীতে অনেক খারাপ মানুষ পাওয়া যায়, কিন্তু একজনও খারাপ বাবা পাওয়া যায় না যিনি সন্তানের অমঙ্গল কামনা করেন।” বাস্তবতা সব পরিবারের জন্য এক নয়, তবুও অধিকাংশ বাবা নিজের স্বপ্ন, স্বাচ্ছন্দ্য ও সুখ বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে নিরলস সংগ্রাম করেন। তাঁদের ভালোবাসা উচ্চারণে নয়, প্রকাশ পায় ত্যাগে, দায়িত্বে ও নীরব পরিশ্রমে।
ইতিহাসও সেই ভালোবাসার সাক্ষী। মুঘল ঐতিহ্যের একটি সুপরিচিত বর্ণনায় বলা হয়, সম্রাট হুমায়ুন তাঁর অসুস্থ পুত্র আকবরের জীবন রক্ষার জন্য নিজের জীবন আল্লাহর কাছে উৎসর্গ করার প্রার্থনা করেছিলেন। এ ঘটনার ঐতিহাসিক নির্ভুলতা নিয়ে মতভেদ থাকলেও, এটি পিতার আত্মত্যাগের এক অনন্য প্রতীক হয়ে আছে।
অন্যদিকে, ভারতের রেমন্ড গ্রুপ-এর সাবেক চেয়ারম্যান বিজয়পাত সিংহানিয়া জীবদ্দশায় নিজের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ছেলের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে পারিবারিক সম্পর্কে টানাপোড়েনের কারণে তাঁকে সামান্য মাথাগোঁজা আশ্রয় এর জন্য অনিশ্চয়তা মুখোমুখি হতে হয়! ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয়—পিতার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও বিশ্বাসের প্রতিদান সব সময় সমানভাবে ফিরে আসে না।
আজকের সমাজে অসংখ্য পিতা-মাতা সন্তানের শিক্ষা, কর্মজীবন ও প্রতিষ্ঠার জন্য জীবনের শেষ সম্বলটুকুও অকাতরে বিলিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু এর বিপরীতে অনেক ক্ষেত্রেই সন্তানের দায়িত্ববোধ, যত্ন ও কৃতজ্ঞতার উদাহরণ নিতান্তই হাতেগোনা। এটি কোনো সার্বজনীন বাস্তবতা নয়, তবে সভ্য সমাজের জন্য নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়।
বাবা দিবস কেবল শুভেচ্ছা বিনিময়ের উপলক্ষ নয়; এটি আত্মজিজ্ঞাসারও দিন। আমরা কি আমাদের বাবা-মায়ের ত্যাগের মর্যাদা দিচ্ছি? মনে রাখা প্রয়োজন, আজকের সন্তানই আগামীর বাবা-মা। তাই মানবিক ও সভ্য সমাজ গড়ে তুলতে পরিবার থেকেই বাবা-মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ ও কৃতজ্ঞতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার সময় এখনই।
যাঁদের বাবা আজও পাশে আছেন, তাঁকে সময় দিন, তাঁর হাতটি ধরে বলুন—”বাবা, তোমাকে ভালোবাসি।” আর যাঁদের বাবা আর নেই, তাঁদের জন্য দোয়া করুন এবং তাঁর আদর্শকে জীবনের পথচলার প্রেরণা করে রাখুন। বাবা দিবসে সকল ত্যাগী, সংগ্রামী ও নিঃস্বার্থ বাবার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও অফুরন্ত ভালোবাসা। কারণ, বাবার দেওয়া সম্পদ একদিন শেষ হতে পারে; কিন্তু তাঁর দেওয়া আদর্শ, সততা ও ভালোবাসাই সন্তানের জীবনের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।



