কর্মধিকার হোক শ্রমাধিকারের ভিত্তি : কৃষিবিদ মনিরুজ্জামান বাবুল

মহান মে—শ্রমজীবী মানুষের বলিষ্ঠ কণ্ঠের সমুচ্চারিত এক ঐতিহাসিক প্রতিধ্বনি। প্রতি বছর ১ মে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দিনটি যথাযথ ভাবগাম্ভীর্যে পালিত হয়। তবে ক্যালেন্ডারের দিন পেরিয়ে গেলেও শ্রমিকের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায্যতার প্রশ্ন থেমে থাকে না; এটি এক অবিরাম চেতনার যাত্রা। সময়ের পরিবর্তনে শ্রমের সংজ্ঞা যেমন বদলেছে, তেমনি বিস্তৃত হয়েছে শ্রম অধিকারের পরিধিও। আজ শুধু পারিশ্রমিক নয়—সামাজিক মর্যাদা, স্বীকৃতি ও নিরাপত্তাও শ্রম অধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রযুক্তি ও বিশ্বায়নের যুগে শ্রম, শ্রমিক ও আয় আর ভৌগোলিক সীমারেখায় আবদ্ধ নয়; অনেক কাজ অদৃশ্য, অনেক কর্মঘণ্টা অপ্রকাশ্য। ফলে প্রচলিত মানদণ্ডে শ্রমের মূল্যায়ন ক্রমেই অপ্রতুল হয়ে পড়ছে। তাই খাতভিত্তিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে শ্রমের নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং ন্যায্যতা, ইনসাফ ও মর্যাদার মানদণ্ডে পুনর্মূল্যায়ন এখন সময়ের দাবি।

১৮৮৬ সালের শিকাগোর হে-মার্কেট আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে—মানবিক কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি ও নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা কোনো অনুগ্রহ নয়, বরং অধিকার। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এই ধারণা আরও বিস্তৃত হয়ে “কর্মধিকার” ও “মূল্যায়নের অধিকার”-এর সাথে যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ, কাজ পাওয়ার সুযোগ এবং কাজের যথাযথ স্বীকৃতি—দুটিই এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শ্রম অধিকারের বড় চ্যালেঞ্জ কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় না। ফলে বেকারত্ব ও আংশিক বেকারত্ব বাড়ছে। কাজের সুযোগ না থাকলে শ্রম অধিকার বাস্তবে অর্থহীন হয়ে পড়ে। তাই “কর্মধিকার” নিশ্চিত করাই হতে হবে শ্রম অধিকারের ভিত্তি।

তবে শুধু কাজের সুযোগ নয়—কাজের মান, কর্মপরিবেশ ও সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি ও উৎপাদনমুখী শ্রমিকরা আজও কাঙ্ক্ষিত মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত, অথচ তারাই অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি। একইভাবে ঝুঁকিপূর্ণ সেবাখাতে নিয়োজিত কর্মীদের শ্রমও যথাযথ স্বীকৃতি দাবি করে।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজশাহীতে রোগীর স্বজনদের দ্বারা চিকিৎসক ও নার্স নিগৃহীত হওয়ার ঘটনা আমাদের সামনে একটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। এটি প্রমাণ করে—শ্রমের মূল্যায়ন আজ শুধু মজুরি বা কর্মঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নিরাপত্তা ও সামাজিক সম্মান এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন পেশাজীবী যদি তার কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তবে তার কর্মঅধিকার ও মূল্যায়নের অধিকার দুটোই ক্ষুণ্ন হয়। এই প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তার অধিকারকে শ্রম অধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।

একই সঙ্গে শ্রম অধিকারের পক্ষে সোচ্চার “শব্দ শ্রমিক” বা মিডিয়াকর্মীদের একটি বড় অংশ নিজেরাই ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত—এ বাস্তবতাও উপেক্ষা করা যায় না। অষ্টম ওয়েজবোর্ড ঘোষিত হলেও বাস্তবায়নে বৈষম্য রয়েছে; অনেকেই নামমাত্র পারিশ্রমিকে কাজ করতে বাধ্য হন এবং চাকরি হারানোর ভয়ে নীরব থাকেন। এটি শ্রম অধিকারের এক নীরব সংকট।

অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতেও শ্রমের যথাযথ স্বীকৃতি অনুপস্থিত। হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী সহায়তাকারীরা অনেক সময় ‘দালাল’ হিসেবে পরিচিত হন, অথচ তাদের কাজের একটি বাস্তব প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। নীতিমালার আওতায় এনে তাদের “সেবা সহকারী” হিসেবে স্বীকৃতি দিলে তাদের মর্যাদা যেমন বাড়বে, তেমনি সেবার মানও উন্নত হবে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার “শোভন কাজ” ধারণা আমাদের একটি সুস্পষ্ট পথনির্দেশ দেয়—কর্মসংস্থান, শ্রম অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা ও মর্যাদা—এই চারটি স্তম্ভ নিশ্চিত করেই একটি টেকসই শ্রমব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

মে দিবসের তাৎপর্য পেরিয়ে আজকের বাস্তবতায় তাই নতুন করে উচ্চারণ করা প্রয়োজন—
শ্রম অধিকার, কর্মধিকার, মূল্যায়নের অধিকার এবং নিরাপত্তার অধিকার—এই সমন্বয়েই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।