স্টাফ রিপোর্টার
চুয়াডাঙ্গায় হঠাৎ করেই ডায়রিয়া রোগের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। জেলা সদর হাসপাতালে ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে, যা বর্তমানে ধারণক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। হাসপাতালটির ডায়রিয়া ওয়ার্ডটি ৫ শয্যা বিশিষ্ট হলেও রোগী ভর্তি রয়েছেন ১২৬ জন। ডায়রিয়া ওয়ার্ডে শয্যা না পেয়ে অনেক রোগীকে হাসপাতালের বারান্দায় ও মেঝেতে চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে। হঠাৎ রোগীর এই উপচে পড়া ভিড়ে চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন কর্তৃপক্ষ। সেই সাথে হাসপাতালের ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। ড্রেন থেকে দুর্গন্ধযুক্ত পচা পানিতে রোগী ও তাদের স্বজনেরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। হাসপাতালের এই দূষিত পরিবেশের জন্য পৌরসভাকে দুষছেন অনেকে।
গতকাল শনিবার দুপুরে সরেজমিনে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও নার্স না থাকায় সেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। হাসপাতালে ডায়রিয়া ওয়ার্ডটি ৫ শয্যা বিশিষ্ট হলেও সেখানে ভর্তি রয়েছেন ১২৬ জন ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী। ওয়ার্ডে জায়গা না পেয়ে বাইরে বারান্দার মেঝেতে শুয়ে থাকতে দেখা গেছে অনেককেই। সেই সাথে হাসপাতালের ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। ড্রেনের বর্জ উপচে পড়ছে। ড্রেন থেকে পঁচা পানির দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে হাসপাতাল প্রাঙ্গনে। হাসপাতালের এই দূষিত পরিবেশ নিয়ে অভিযোগের যেন শেষ নেই।
ডায়রিয়া ওয়ার্ডের বারান্দার মেঝেতে অবস্থানরত দামুড়হুদা উপজেলার প্রতাপপুর গ্রামের শিশু আয়ানের মা বলেন, হাসপাতালে ডায়রিয়া রোগী প্রচুর চাপ। যার কারণে ওয়ার্ডে জায়গা না পেয়ে হাসপাতালে বারান্দার মেঝেতেই শুয়ে থাকতে হচ্ছে। গত পরশু বিকেলে শিশু আয়ান ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। তারপর পরই তাকে নিয়ে চলে এসেছি চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে। এসে দেখি রোগীদের উপচে পড়া ভিড় যার কারণে ওয়ার্ডে জায়গা হয়নি আমাদের। ঠিকমতো চিকিৎসা পাচ্ছি, তবে রাত হলেই শীতে একটু কষ্ট পাচ্ছি। ডায়রিয়া ওয়ার্ডে শষ্যা সংখ্যা বাড়লে রোগীদের কষ্ট কিছুটা লাঘব হতো।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগের স্বজন শোয়েব আলী জানান, আমরা রোগ মুক্তির জন্য হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসি। এসে যদি হাসপাতালে ড্রেনের এই তীব্র পচা দুর্গন্ধে আমাদের শরীর আরো অসুস্থ হয়ে যায় তাহলে হাসপাতালে আসার মানেটা কি? হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যদি যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিতো তাহলে ড্রেনেজ ব্যবস্থা আর উন্নত করা যেতো। এখানে অনেক শ্বাসকষ্টের রোগী আসেন তারা এই ড্রেনের দুর্গন্ধে তাদের অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যায়। আমরা চাই দ্রুত এখানকার পরিবেশ আরো ভালো করা হোক।
হাসপাতালের সিনিয়র নার্স মহিমা আক্তার জানান, রোগীর সংখ্যার তুলনায় নার্সের সংখ্যা অত্যন্ত কম। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় আমরা নার্সরা সেবা দিতে গিয়ে পুরোপুরি হিমশিম খাচ্ছি। একসাথে এত রোগীকে সামলানো আমাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। নার্স ও স্টাফদের সহায়তায় হাসপাতালে স্বেচ্ছাসেবকরা কাজ করছেন। প্রতি শিফটে মাত্র ১জন করে স্বেচ্ছাসেবক দায়িত্ব পালন করছেন। এভাবে মোট ৩ শিফটে ৩ জন স্বেচ্ছাসেবক দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন।
আবহাওয়া পরিবর্তন বা পানির সমস্যার কারণে এই প্রকোপ কি না, তা খতিয়ে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দ্রুত জনবল বাড়ানো এবং ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। আতঙ্কিত না হয়ে সাধারণ মানুষকে বিশুদ্ধ পানি পান ও বাসি খাবার পরিহার করার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।
এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. বিদ্যুৎ কুমার বিশ্বাস বলেন, এখন পর্যন্ত হাসপাতালে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ভর্তি আছে ১২৬ জন রোগী। পার্শ্ববর্তী জেলা মেহেরপুরে ১৬৫ জন নার্স আছে, চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে মাত্র ৬৫ জন নার্স। এখন এই ১২৬ জন রোগীকে চিকিৎসা সেবা দিতে আমাদের বেগ পেতে হচ্ছে। আমাদের প্রতি শিফটে একজন করে ভলান্টিয়ার (স্বেচ্ছাসেবক) কাজ করে। তিন শিফটে তিনজন ভলান্টিয়ার কাজ করে। আসলে এই সময়ে মানুষের একটু সচেতন হওয়া দরকার। পানি ফুটিয়ে খাওয়া, বাইরের বাসি খাবার না খাওয়া এগুলো মেনে চললে ডায়রিয়া থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। আর যদি বমি না থাকে, তবে বেশি বেশি খাওয়ার স্যালাইন খেতে হবে। অবস্থা বেশি খারাপ হলে হাসপাতালে আসতে হবে।
হাসপাতালের ড্রেনেজ বিষয় তিনি বলেন, আমাদের হাসপাতালের পরিবেশও খুব একটা ভালো না। আমাদের ড্রেনগুলো একদম নিচু। অনেক ময়লা-আবর্জনা জমে থাকে সেখানে। যেখান থেকে দুর্গন্ধের উৎপত্তি। পিডব্লিউডি (চডউ) বা পৌরসভা থেকে যদি এই ড্রেনগুলো একটু উঁচু করে দিত বা পরিষ্কারের ব্যবস্থা করত, তাহলে আমাদের এই পরিবেশটা একটু ভালো থাকত। হাসপাতালে ড্রেনেজ ব্যবস্থার এই অবনতির পিছনে পৌরসভা দায়ী। পৌরসভা থেকে যদি ঠিক মতো পরিচ্ছন্ন কর্মী এসে এগুলো পরিষ্কার করে দিতো, তাহলে এতো দূর্গন্ধ হতো না।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীদের উপচে পড়া ভিড় হাসপাতালের ড্রেনের ময়লা পানির তীব্র দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনেরা



