রাজধানী ঢাকা ছেড়ে আলমডাঙ্গায় আধ্যাত্মিক জীবনের সন্ধানে ফকির সাইজি

খন্দকার শাহ আলম মন্টু, আলমডাঙ্গা
রাজধানী ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবন ছেড়ে আলমডাঙ্গার এক শান্ত গ্রামে আধ্যাত্মিক সাধনা ও মানবসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন শাহ ফকির মোহাম্মদ আলী আজমিরী সাইজি। আলমডাঙ্গা উপজেলার নাগদাহ ইউনিয়নের নিরিবিলি প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে তোলা তার ছোট্ট আশ্রমকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে সৃষ্টি হয়েছে একটি মানবিক ও আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডল। জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকার মতিঝিলের ফকিরাপুল এলাকায়। তবে নগরজীবনের কোলাহল, দূষণ ও যান্ত্রিকতা তাকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তুলেছিল। আধ্যাত্মিক সাধনা এবং প্রকৃতির সান্নিধ্যের আকর্ষণে তিনি আলমডাঙ্গায় স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন।
ফকির মোহাম্মদ আলী আজমিরী সাইজি বলেন, আমি মূলত ঢাকার ছেলে। কিন্তু নগরজীবনের ব্যস্ততা আমাকে কখনো প্রকৃত শান্তি দিতে পারেনি। আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায়, প্রকৃতির টানে এবং আধ্যাত্মিক সাধনার উদ্দেশ্যে আলমডাঙ্গায় চলে আসি। এখানকার মানুষের আন্তরিকতা, সহজ জীবনযাপন ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করেছে।
তিনি জানান, ছোটবেলা থেকেই ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। পরিবারে নিয়মিত উরস, মিলাদ ও বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজন অনুষ্ঠিত হতো। পরিবারের সদস্যদের অনেকেই সুফি তরিকা ও বিভিন্ন দরবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। সেই পরিবেশ থেকেই তার আধ্যাত্মিকতার প্রতি আগ্রহ জন্ম নেয়। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের বিভিন্ন আধ্যাত্মিক কেন্দ্র, দরবার ও অলিদের মাজার পরিদর্শন করে আত্মিক শিক্ষা অর্জন করেন। পরবর্তীতে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে দীক্ষা গ্রহণ করে খিলাফত লাভ করেন।
তার দাবি, কয়েক দশক ধরে তিনি মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক চেতনার বার্তা প্রচার করে আসছেন। তিনি বলেন, শান্তির সন্ধানে আমি প্রকৃতির কাছে ফিরে এসেছি। আল্লাহর ইবাদত, মানুষের সেবা এবং সহজ-সরল জীবনই এখন আমার পথচলার মূল ভিত্তি। করোনাকালে কয়েকজন ভক্তের আমন্ত্রণে তিনি আলমডাঙ্গায় আসেন। প্রথমদিকে একটি ছোট কুঁড়েঘরে বসবাস শুরু করেন। হাতে অর্থ না থাকলেও আল্লাহর ওপর ভরসা ছিল বলেই তিনি জানান। ধীরে ধীরে তার আশ্রমে ভক্ত ও অনুসারীদের সমাগম বাড়তে থাকে।
বর্তমানে আশ্রমে নিয়মিত ধর্মীয় আলোচনা, মানবিক মূল্যবোধের চর্চা, আধ্যাত্মিক শিক্ষা এবং পারস্পরিক সহযোগিতামূলক নানা কার্যক্রম পরিচালিত হয় বলে আশ্রমসংশ্লিষ্টরা জানান।
লালনের দর্শন প্রসঙ্গে ফকির সাইজি বলেন, অনেকে আমাকে লালন পরিবারের সদস্য বলে থাকেন। আসলে লালন কোনো পরিবার নয়, এটি একটি দর্শন। মানুষে মানুষে ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ববোধ, দয়া, সেবা এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি আত্মসমর্পণই লালনের মূল শিক্ষা। আমি সেই দর্শনের একজন ক্ষুদ্র অনুসারী মাত্র। যে পথই অনুসরণ করি না কেন, তা যেন আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর প্রদর্শিত পথের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। মানুষকে বিভক্ত নয়, বরং সত্য, ন্যায় ও মানবতার পথে পরিচালিত করাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।
সাইজির সহধর্মিণী শিউলি আক্তার জয়া ফকিরানী বলেন, আমি তাকে শুধু স্বামী হিসেবেই দেখি না, একজন আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক হিসেবেও দেখি। তার কাছ থেকে জীবনের অনেক মূল্যবান শিক্ষা পেয়েছি। আমরা হয়তো অর্থনৈতিকভাবে ধনী নই, কিন্তু মানসিকভাবে অনেক সমৃদ্ধ। আল্লাহর ওপর ভরসা করেই আমাদের জীবন চলছে।
আশ্রমে আগত ভক্তদের ভাষ্য, সাইজির কাছ থেকে তারা মানবতা, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক জীবনের শিক্ষা লাভ করেছেন। তিনি মানুষকে ধর্মীয় পরিচয়ের আগে মানুষ হিসেবে মূল্যায়নের শিক্ষা দেন এবং পারস্পরিক ভালোবাসা ও সহমর্মিতার বার্তা ছড়িয়ে দেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, আলমডাঙ্গায় আসার পর থেকেই তিনি এলাকার মানুষের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছেন। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বসবাসের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সঙ্গে আন্তরিক আচরণের জন্য তিনি পরিচিত হয়ে উঠেছেন।
স্থানীয় এক ওয়ার্ড সদস্য বলেন, আশ্রমটি প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এখানে আসছেন। এখন পর্যন্ত আশ্রমকে কেন্দ্র করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। স্থানীয় জনগণের সঙ্গে আশ্রম কর্তৃপক্ষের সুসম্পর্ক রয়েছে।
সাক্ষাৎকারের শেষ পর্যায়ে ফকির মোহাম্মদ আলী আজমিরী সাইজি বলেন, আমার সকলের প্রতি একটাই আহ্বান—অন্যায় থেকে দূরে থাকুন, সৎ কাজ করুন, একে অপরকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসুন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর দেখানো পথে চলুন। তাহলেই দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা অর্জন সম্ভব।
ঢাকার ব্যস্ত জীবন ছেড়ে আলমডাঙ্গার নির্জন গ্রামে এসে নতুন এক জীবন গড়ে তুলেছেন ফকির মোহাম্মদ আলী আজমিরী সাইজি। আধ্যাত্মিক সাধনা, মানবিক মূল্যবোধের প্রচার এবং ভালোবাসা ও সহমর্মিতার বার্তা ছড়িয়ে দিয়ে তিনি ইতোমধ্যে এলাকায় একটি পরিচিত নাম হয়ে উঠেছেন। তার বিশ্বাস, মানবতা, নৈতিকতা ও পারস্পরিক ভালোবাসার মধ্য দিয়েই সমাজে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।