নাজমুল হক শাওন, আলমডাঙ্গা
আলমডাঙ্গা পৌর এলাকার পুরাতন মোটরসাইকেল হাট একসময় যা ছিল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রাণবন্ত যানবাহন বাজার আজ সেখানে নেমে এসেছে নীরবতা। জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট, বিশেষ করে পেট্রোল ও অকটেনের অপ্রতুলতায় ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়েছে হাট। ফলে ধসে পড়েছে বেচাকেনা, বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট শতাধিক মানুষ।
হাট সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, মাত্র তিন সপ্তাহ আগেও প্রতি হাটবারে ৪০০ থেকে ৬০০টি পুরাতন মোটরসাইকেল কেনাবেচা হতো। দূর-দূরান্ত থেকে ক্রেতা-বিক্রেতারা ভিড় জমাতেন এই হাটে। কিন্তু বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৫০ থেকে ২০০-তে। গতকাল শুক্রবার আলমডাঙ্গা পৌর বাস টার্মিনাল সংলগ্ন হাটে চলতি বছরের সর্বনিম্ন বেচাকেনা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ সময়টাকে ঘিরেই মূলত মোটরসাইকেল ব্যবসার সোনালী মৌসুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ, ভুট্টা বিক্রির পর কৃষকদের হাতে নগদ অর্থ আসে, আর সেই অর্থ দিয়েই অনেকেই পুরাতন মোটরসাইকেল কেনেন—নিজস্ব ব্যবহারের জন্য কিংবা আয়ের উৎস হিসেবে। কিন্তু এবার সেই চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। অর্থ থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি সংকটের কারণে মানুষ পুরাতন মোটরসাইকেল কেনার আগ্রহ হারাচ্ছেন। পুরাতন মোটরসাইকেল বিক্রেতা টুটুলের কণ্ঠে হতাশা, এই সময়টাতে আমাদের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়ার কথা। কিন্তু এখন মানুষ আসেই না। যারা আসে, তারাও শুধু দেখে চলে যায়। তেল না থাকলে বাইক কিনে কী করবে?
ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের বলেন অনেকের হাতে এখন ভুট্টার টাকা আছে, কিন্তু তারা বাইক কিনতে ভয় পাচ্ছে। কারণ জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। এই অনিশ্চয়তায় কেউ বিনিয়োগ করতে চায় না। এই মোটরসাইকেল হাটকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক চক্র। হাটে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন ৭০ থেকে ৮০ জন শ্রমিক, পরিবহনকর্মী, মেকানিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। হাটের ইজারাদার পক্ষে নাসিরউদ্দিন জানান, প্রতিদিন এই হাটের সঙ্গে ৭০-৮০ জন মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। কিন্তু এখন যে অল্প বেচাকেনা হচ্ছে, সেই টাকাতেই তাদের পারিশ্রমিক দিতে হচ্ছে। এতে আমরা নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।
তিনি আরও বলেন,এই অবস্থা চলতে থাকলে ইজারার টাকা জোগাড় করতে আমাদের জমি-জমা বিক্রি করতে হতে পারে। এত বড় ক্ষতি আমরা কীভাবে সামাল দেবো, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। শুধু মোটরসাইকেল হাট নয়, এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে পুরো আলমডাঙ্গা এলাকার অর্থনীতিতে। মোটরসাইকেল কেনাবেচা কমে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ী, গ্যারেজ মালিক, এমনকি চা-দোকানিরাও।
স্থানীয়দের মতে, মোটরসাইকেল এখন শুধু ব্যক্তিগত বাহন নয়—গ্রামীণ যোগাযোগ ও আয়ের অন্যতম মাধ্যম। বিশেষ করে ডেলিভারি, ভাড়া চালানো এবং কৃষিপণ্য পরিবহনে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে এই খাতের স্থবিরতা সামগ্রিক অর্থনীতিতেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের একটাই দাবি—দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা। তাদের মতে, এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু একটি হাট নয়, বরং পুরো অঞ্চলের ক্ষুদ্র অর্থনীতি ভেঙে পড়তে পারে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, আলমডাঙ্গার ঐতিহ্যবাহী এই মোটরসাইকেল হাট হয়তো হারিয়ে ফেলবে তার পুরনো প্রাণচাঞ্চল্য—আর এর সঙ্গে হারিয়ে যাবে অনেক মানুষের জীবিকার শেষ আশ্রয়ও।
জ্বালানি সংকটে ধুঁকছে আলমডাঙ্গার ঐতিহ্যবাহী মোটরসাইকেল হাট ভুট্টা মৌসুমেও নেই ক্রেতার ভিড়, বছরের সর্বনিম্ন বেচাকেনা হুমকিতে শতাধিক মানুষের জীবিকা



