চুয়াডাঙ্গায় জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট, বেশিরভাগ পাম্পে তেল নেই তেল নিতে বিভিন্ন যানবাহনের লম্বা লাইন হণ্যে হয়ে ঘুরছে এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে

স্টাফ রিপোর্টার
চুয়াডাঙ্গা জেলাজুড়ে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ জ্বালানি তেল সংকট। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ তলানিতে নামায় জেলার অধিকাংশ ফিলিং স্টেশন এখন প্রায় তেলশূন্য। মাঝে মাঝে ডিপো থেকে সীমিত পরিমাণ তেল আসছে যা গ্রাহকদের জ্বালানি তেলের চাহিদা পূরণ করতে পারছেনা। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তেল না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন যানবাহন চালক ও কৃষকরা। এদিকে দিনের বেশিরভাগ পাম্পে তেল নেই বলে, বাশ দিয়ে বেরিকেড করে রাখা হচ্ছে পাম্পগুলো।  চুয়াডাঙ্গা জেলার বিভিন্ন পাম্পগুলোতে দেখা গেছে ক্রেতাদের লম্বা লাইন। পাম্প মালিকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা এবং সরবরাহ ঘাটতির কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
জানা যায়, সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ চেইন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে। চুয়াডাঙ্গা জেলার পাম্পগুলোতে গত কয়েকদিন ধরে চাহিদামত তেলের বরাদ্দ মিলছে না। তেলবাহী লরিগুলো ডিপো থেকে সীমিত পরিমান তেল নিয়ে ফিরছে যা বরাদ্দের তুলনায় অত্যন্ত সামান্য।  
সরেজমিনে চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন তেল পাম্প গুলো ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ পাম্পের সামনে ‘তেল নেই’ লেখা সংবলিত বোর্ড ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। যে কয়েকটি পাম্পে তেল অবশিষ্ট আছে, সেখানেও জনপ্রতি সর্বোচ্চ ২০০-৫০০ টাকার বেশি তেল দেয়া হচ্ছে না। তেলের আশায় পাম্পগুলোতে ভিড় করছেন মোটরসাইকেল ও ট্রাক চালকরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও অনেকে তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। অনেকে আবার তেলশূন্য বাইক রাস্তায় রেখে বোতল হাতে পাম্পে ছুটে আসছেন তেল পাবার আশায়। কিন্তু পাম্পে এসে দেখতে পাচ্ছেন ভিন্ন চিত্র, লম্বা লাইনে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে আছেন ক্রেতারা। কিছু কিছু জায়গায় তেল পাওয়া গেলেও সেখানে দেখা গেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দ্বারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে তেল বিক্রয় করা হচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গা মূলত কৃষিপ্রধান অঞ্চল। বর্তমানে সেচ মৌসুম চলায় ডিজেলের চাহিদা তুঙ্গে। তেল না পাওয়ায় সেচ পাম্পগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, যা বোরো আবাদে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। অন্যদিকে, পরিবহন চালকদের অভিযোগ তেল সংকটের অজুহাতে কোনো কোনো জায়গায় চড়া দামে তেল বিক্রি করা হচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গার মেসার্স মোজাম্মেল হক পেট্রোল পাম্পের ক্যাশিয়ার মামুন হোসেন জানান, গতকাল ৩ হাজার লিটার পেট্রোল ও ৩ হাজার লিটার অকটেন এবং সাড়ে ৪ হাজার লিটার ডিজেল তেল এসেছিলো। রাত থেকে বিক্রয় শুরু হয়ে বেলা আড়াইটার মধ্যে সব বিক্রি শেষ। দিনরাত সবসময় ক্রেতাদের উপস্থিতি ছিল ব্যাপক। ডিপো থেকে তেল না আসলে আমরা দেব কোত্থেকে? মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে আমদানি কম হচ্ছে বলে আমাদের জানানো হয়েছে। আবারো রিকোজিশন দেওয়া হয়েছে আজকে রাত বারোটার মধ্যে তেল চলে আসবে আশা করি। তেল আপলোড হওয়ার পরপরই ক্রেতাদেরকে এই তেল বিক্রয় করা হবে।
তেল ক্রয় করতে আসা ক্রেতা আসাদুর রহমান বলেন, সারাদিনে অন্তত চারটি পাম্প ঘুরেছি কোথাও তেল পাইনি। বাইকে যে পরিমাণ তেল আছে তা দিয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়া সম্ভব না। কয়েকটি পাম্পে দেখেছি অতিরিক্ত ভিড় যার কারণে সেখান থেকে তেল ক্রয় করাও সম্ভব হয়নি। জ্বালানি তেলের এমন সংকট হলে আমরা যাব কোথায়? যত দ্রুত সম্ভব এই জ্বালানি তেলের সংকট কাটিয়ে ওঠা জরুরি।
চুয়াডাঙ্গার মেসেজ হাইওয়ে ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার জাকিরুল ইসলাম বলেন, পাম্পের বর্তমানে পেট্রোল ও অক্টেন তেল নেই। গতকাল আড়াই হাজার লিটার পেট্রোল ও ৬ হাজার লিটার ডিজেল এসেছিলো। রাত দুইটা থেকে বেলা সাড়ে বারোটার মধ্যে বিক্রি শেষ। ক্রেতাদের অধিক চাহিদার ফলে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। গত রাত ২টা থেকেই দুপুর সাড়ে বারোটা পর্যন্ত ক্রেতাদের অতিরিক্ত চাপ ছিল। আমরা তাদের নিকট তেল বিক্রয় করতে অধিক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।  আজ রাতে ৯ হাজার লিটার ডিজেল, ৩ হাজার লিটার পেট্রোল ও ৩ হাজার লিটার অকটেন তেল আসবে। এ সকল জ্বালানি তেল আমাদের নিকট এসে পৌঁছালেই আমরা তা বিক্রয় করতে পারব।  
চুয়াডাঙ্গা টার্মিনালে মামুন ফিলিং স্টেশন পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, এখানে বিকাল বেলায় ক্রেতা সাধারণের মাঝে পেট্রোল তেল বিক্রয় করা হয়। তেলের সংকট থাকায় ক্রেতাদেরকে ২০০ থেকে ৫০০ টাকার তেল দেওয়া হয়। তেল ক্রয় কালে সকল প্রকার বিশৃঙ্খলা এড়াতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। এ সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এএসআই বাবুল হোসেন বলেন, মেসার্স মামুন ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল বিক্রি করা হচ্ছে। সকল ক্রেতারা সুশৃংখলভাবে এসে লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিচ্ছেন। এখানে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে।
সরকারিভাবে বিকল্প উৎস থেকে তেল আমদানি ত্বরান্বিত না করলে এই সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে বলে দাবি বিশ্লেষকদের।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।