তৌহিদ উদ দৌলা রেজা, মেহেরপুর
বজ্র নিরোধক, ভূমিক্ষয় রোধ, ভূমিধস, ভূগর্ভস্থ পানির মজুদ বৃদ্ধি, মাটির উর্বরাশক্তি রক্ষাকারী পরিবেশ বান্ধব তালগাছে দেখা দিয়েছে রেড পাম উইভিলের আক্রমন। মেহেরপুরের গাংনীর একই এলাকার কয়েক হাজার তাল গাছ সরেজমিনে পরিদর্শন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা। এ পোকার আক্রমনের ভয়াবহতা বুঝে ওঠার আগেই তিন শতাধিক গাছ মারা গেছে। আক্রমনের শিকার হয়েছে আরো সহস্রাধিক তালগাছ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চিৎলা পাটবীজ খামারে রোপিত গাছগুলি। এ সংক্রমন রোধে ইতোমধ্যে তিনজন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা চিৎলা পাটবীজ খামার এলাকায় সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৃক্ষপ্রেমী হিসেবে পরিচিত চিৎলা গ্রামের বাসিন্দা ওয়াসিম সাজ্জাদ লিখন ২০১৮ সাল থেকে চিৎলা পাটবীজ খামারের সীমানাসহ ভিতরের রাস্তা এবং জেলার বিভিন্ন স্থানে প্রায় তিন লাখ বৃক্ষ রোপন শুরু করেন। যার সিংহভাগই তালের বীজ রোপন করেন। তালবীজ থেকে চারা হয়ে বেশ বড় হয়ে উঠতে থাকে। হঠাৎ করেই বিভিন্ন স্থানে তালগাছগুলো শুকিয়ে মারা যাচ্ছিলো। তাই গাছগুলো রক্ষার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।
ওয়াসিম সাজ্জাদ লিখন জানান, পরিবেশ রক্ষায় স্ব-প্রণোদিত হয়ে তিনি এলাকায় তালবীজসহ বিভিন্ন গাছের চারা রোপন করেছেন। আশে-পাশের গাছগুলো নিজেই পরিচর্যা করেন। কয়েকমাস আগে দু-একটি তালগাছের পাতা ও মাইজপাতা শুকয়ে যেতে দেখা যায়। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে তিন শতাধিক তালগাছ মারা যায়। গাছের কাণ্ড ও গোড়ায় কালো ও সাদা রংয়ের পোঁকা দেখা যাচ্ছে। আক্রান্ত গাছের ভেতরের অংশ ঝুরঝুরে ময়দার মতো হয়ে যাচ্ছে এবং ধীরে ধীরে গাছ শুকিয়ে মারা যাচ্ছে। এ বিষয়টি কৃষি অফিস ও বন বিভাগে জানানো হয়।
গাংনী উপজেলা কৃষি অফিসার মতিয়র রহমান ঘটনাস্থল পরিদর্শ করেছেন এবং প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হন এটি রেড পাম উইভিলের আক্রমন। তিনি উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরকে তালগাছের মড়কের ব্যাপারে নিশ্চিত করেন ও বিশেষজ্ঞদের পরিদর্শন ও পরামর্শের আবেদন জানান।
গাংনী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মতিউর রহমান জানান, তালগাছ মারা যাওয়ার খবর পেয়ে আমি ঘটনাস্থলে যায় এবং মারা যাওয়া কয়েকটি গাছ চিরে নিশ্চিত হতে পারি এটি রেড পাম উইভিলের আক্রমন। রেড পাম উইভিল মূলতঃ চার থেকে ছয় বছর বয়সী গাছকে আক্রমণ করে। গাছের ভেতরের নরম অংশ খেয়ে নেয়। ফলে ধীরে ধীরে গাছ মারা যায়। তিনি বিশেষজ্ঞদের পরিদর্শন ও পরামর্শের আবেদন জানালে তিনজন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন।
বাংলাদেশ সুগার ক্রপ গবেষণা ইন্সটিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নুরে আলম জানান, সৌদিতে খেজুরের ছোট ছোট গাছে রেড পাম উইভিল নামের একটি পোকা প্রথম পাওয়া যায়। নরম কান্ড হওয়ায় এই পোকা খেজুর গাছে আক্রমণ করে থাকে। তবে সময়ের পরিক্রমায় এই পোকা এখন আক্রমণ করতে শুরু করেছে দেশীয় তাল ও নারিকেল গাছে। অথচ দেশীয় তাল বা খেজুর গাছের কান্ড শক্ত থাকায় এই গাছে আক্রমণ করতে পারত না। সময়ের সাথে সেই সক্ষমতাও অর্জন করেছে রেড পাম উইভিল। এই ঘটনা প্রথম ঘটে রাজশাহীর বাগমারাতে। দ্বিতীয় বারের মতো ঘটনা দেখা গেল মেহেরপুরের গাংনীর চিৎলা পাটবীজ খামারে।
রেড পাম উইভিলের আক্রমন থেকে রক্ষা পেতে প্রাথমিক পর্যায়ে ফেরোমেন ট্রাপ ও ইনসিক্রিসাইট প্রয়োগ করার পাশাপাশি গাছের কচি পাতা না কাটার জন্য পরামর্শ দেন এই বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা।
তালগাছ রক্ষা করতে সরেজমিন পরিদর্শন করেন বাংলাদেশ সুগার ক্রপ গবেষণা ইন্সটিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নুরে আলমের নেতৃত্বে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি টীম পরিদর্শনে আসেন। টীমের অন্য দুই সদস্য হলেন- ড. আনিসুর রহমান ও ড. শামসুল আরেফিন। এ ছাড়াও পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন, মেহেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সঞ্জীব মৃধা, চিৎলা পাটবীজ খামারের যুগ্ম পরিচালক মোর্শেদুল আলম ও গাংনী উপজেলা কৃষি অফিসার মো: মতিয়র রহমান।
রেড পাম উইভিলের আক্রমনে গাংনীতে মারা গেছে তিন শতাধিক তালগাছ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাসহ তিন সদস্যের কমিটির সরেজমিন পরিদর্শন



