৭ নভেম্বরের মধ্য দিয়ে দেশ দ্বিতীয়বারের মতো স্বাধীনতা লাভ করে : রিজভী

আজকের চুয়াডাঙ্গা ডেস্ক

জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সুসংহত করা, গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন এবং মানুষের কথা বলা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। ৭ নভেম্বরের মধ্য দিয়ে দেশ দ্বিতীয়বারের মতো স্বাধীনতা লাভ করে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দুপুরে ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বিএনপির কর্মসূচি ও দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্রের চর্চা ও জাতীয় স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব শক্তিশালী করার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছিল। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বন্ধ দরজা খুলে দিয়েছিলেন।’

তিনি বলেন, ‘পরবর্তী সময়ে যখনই দেশে একদলীয় শাসন ও একনায়কতান্ত্রিক শাসনের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হয়েছে, তখনই ৭ নভেম্বরের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে জনগণ রাজপথে নেমেছে। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানেও সেই চেতনার প্রতিফলন দেখা গেছে।’

রিজভী বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি কয়েক মিনিটের মধ্যে বহুদলীয় গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষাকে ধূলিসাৎ করে দেয়া হয়েছিল। রাজনৈতিক দলগুলো বন্ধ করে দিয়ে একটি মাত্র রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় রাখা হয়েছিল। এরপর একে একে মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা, লেখার স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হয়।’

তার অভিযোগ, ‘১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরা দেশের স্বাধীনতাকেও অরক্ষিত ও বিপন্ন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলেছিলেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি একটি বিদেশী দেশের অনুসারী হয়ে পড়েছিল। সেই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।’

তিনি বলেন, ‘৭ নভেম্বরের মধ্য দিয়ে দেশ দ্বিতীয়বারের মতো স্বাধীনতা লাভ করে এবং জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব শক্তিশালী হয়। বিপ্লবের মধ্য দিয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেন। তিনি একে একে বন্ধ দরজা খুলে দিয়ে গণতন্ত্রের অবাধ চর্চা, কথা বলার স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি করেন।’

৭ নভেম্বরের চেতনায় গণঅভ্যুত্থান
৭ নভেম্বরের চেতনার ধারাবাহিকতা তুলে ধরে রিজভী বলেন, ‘১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে ছাত্র-জনতা ঐক্যবদ্ধ হয়ে হোসেন মুহম্মদ এরশাদের শাসনের অবসান ঘটিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নতুন কায়দায় বাকশাল প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হলেও তা পরাজিত হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানেও ৭ নভেম্বরের চেতনা মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক দর্শন হচ্ছে গণতন্ত্র। এ দেশের মানুষ প্রাণ খুলে কথা বলতে চায়, নির্ভয়ে ও নিঃসংকোচে নিজের মত প্রকাশ করতে চায়। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব শক্তিশালী রাখার আকাঙ্ক্ষা মানুষের মধ্যে সব সময় রয়েছে। ৭ নভেম্বরের চেতনা সেই আকাঙ্ক্ষাকে জাগ্রত করে।’

৭ নভেম্বর উপলক্ষে ঢাকায় বিএনপির শোভাযাত্রা
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বিএনপির সাত দিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামীকাল ৭ নভেম্বর রাজধানী ঢাকায় কেন্দ্রীয় শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শোভাযাত্রার উদ্বোধন করবেন। উদ্বোধনী বক্তব্যের পর শোভাযাত্রা শুরু হবে।

শোভাযাত্রাটি নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে শুরু হয়ে প্রধান বিচারপতির বাসভবনের কাছে গিয়ে ডান দিকে মোড় নেবে। এরপর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে দিয়ে বাংলামোটর, ফার্মগেট হয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে গিয়ে শেষ হবে।

এর আগে সকাল সাড়ে ৮টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধি এবং বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কবরে ফাতেহা পাঠ ও শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন।

রিজভী জানান, ৫ নভেম্বর থেকে সাত দিনের কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরে কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। আগামীকাল দেশের অধিকাংশ জেলা ও মহানগরে শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া দলের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন আলোচনা সভা, পোস্টার লাগানোসহ নানা কর্মসূচি পালন করবে। ৭ নভেম্বরের চেতনায় বিশ্বাসী অন্য রাজনৈতিক দল, জোট, সাংস্কৃতিক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সংগঠনও দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের কর্মসূচি নিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনার সরকার ৭ নভেম্বরের চেতনার প্রতি ভীত হয়ে দিবসটির রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন বন্ধ করেছিল। বিএনপি এবং সমমনা দলগুলো এত দিন দিবসটি পালন করে আসছে। এবার দীর্ঘদিন পর আবারও রাষ্ট্রীয় ও জাতীয়ভাবে দিবসটি পালন করা হবে।’

তিনি আরো বলেন, ৭ নভেম্বরের চেতনা শুধু রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেও আগ্রহ ও আবেদন তৈরি করেছে। এই চেতনার মধ্য দিয়ে জাতীয় স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের ধারাও বিকশিত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

পোশাকশিল্পে অস্থিরতা তৈরির অভিযোগ
সম্প্রতি পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন বিএনপির এই নেতা। ৭ নভেম্বরের শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে কোনো সহিংসতার আশঙ্কা রয়েছে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জনগণ ও সরকার এ বিষয়ে প্রস্তুত রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। তারা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করবে।’

তিনি অভিযোগ করেন, পলাতক আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগীরা বিভিন্নভাবে অরাজকতা তৈরির চেষ্টা করছে। পোশাকশিল্পে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি থাকতে পারে এবং সেসব দাবি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দাবি মেনে নেওয়ার পরও কারখানা ভাঙচুর, পুলিশ বক্সে আগুন দেয়া, গাড়িতে আগুন দেয়া এবং একজন শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যার মতো ঘটনা ঘটেছে। তার দাবি, এসব ঘটনার সাথে প্রকৃত শ্রমিক আন্দোলনের সম্পর্ক নেই।

এ প্রসঙ্গে তিনি শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের নিখোঁজ ও হত্যার ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘২০১১ বা ২০১২ সালে শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কয়েক দিন পর নদীর ধারে তার লাশ পাওয়া যায়। বিষয়টি নিয়ে দেশী-বিদেশী মানবাধিকার সংগঠনগুলো সরব হয়েছিল।’

বিএনপির এই নেতার অভিযোগ, ওই সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতায় গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা ঘটেছিল।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, পোশাকশিল্পে অস্থিরতা তৈরি করে কি পরাজিত শক্তি ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটাতে চায়? বিরোধী মত দমনে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

তার দাবি, সাম্প্রতিক ঘটনায় উসকানিদাতাদের অনেকে গ্রেফতার হয়েছেন। তাদের অধিকাংশই যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা। কোন কারখানার মালিকেরা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত, সেটিও ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন। তার অভিযোগ, এসব কারখানার অধিকাংশ মালিক আওয়ামী লীগ ও ফ্যাসিবাদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট। হঠাৎ কারখানা ছুটি দিয়ে শ্রমিকদের উসকে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

রিজভী বলেন, ‘দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার পর জনগণের ভোটে একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। সেই সরকারকে বিচলিত করতে এবং দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পরিকল্পিতভাবে কাজ করা হচ্ছে।’

পার্শ্ববর্তী দেশ থেকেও উসকানি দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার মতে, আওয়ামী লীগের যেসব নেতা-কর্মী ১৭ বছর ধরে দেশের ব্যাংক, আর্থিক খাত ও রাষ্ট্রীয় কোষাগার লুট করেছেন, তাদের অনেকে বিদেশে পালিয়ে গেছেন। আবার কেউ কেউ দেশে থেকে অরাজকতা তৈরির চেষ্টা করছেন।

শ্রমিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক বিরোধ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি পোশাকশিল্পে সম্ভাব্য অস্থিরতা নিয়ে যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপির ওই নেতা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিভিন্ন সূত্রে আরো বেশি তথ্য পৌঁছায়। তার আশঙ্কার কিছু প্রতিফলন সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে দেখা যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলন এক বিষয়। কিন্তু কারখানা ভাঙচুর, গাড়িতে আগুন দেয়া এবং পুলিশ বক্সে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেয়ার ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এসব কারা করছে, তা সবার কাছে স্পষ্ট।’

শ্রমিকদের সঙ্কট নিরসনে সরকার আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেছে এবং সংকটের সমাধান হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তার বক্তব্য, ‘শ্রমিক নেতারাও বলেছেন, সঙ্কট মোকাবেলা করা হচ্ছে। ফলে এখন যেসব ঘটনা ঘটছে, সেগুলোকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে।’

পোশাকশিল্পের শ্রমিক আন্দোলনে বিরোধী দলগুলোর সমর্থন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তার আলাদা করে কিছু বলার নেই। তবে এসব ঘটনা ফ্যাসিবাদের সাথে গুপ্ত রাজনীতির সম্পর্কের বিষয়টি আবারো সামনে এনেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বিরোধী দলগুলোর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আগুনে ঘি ঢেলে উত্তেজনা সৃষ্টি করে ধোঁয়াশার মধ্যে রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়। এ ধরনের উসকানিতে আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং তার আঁচ সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর গায়েও লাগতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘সরকার দৃঢ়তার সাথে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা প্রতিহত করতে প্রস্তুত। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে। জনগণও যেকোনো অরাজকতা প্রতিহত করতে প্রস্তুত।’

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।