আজকের চুয়াডাঙ্গা ডেস্ক
শনিবার রাত সাড়ে ১০টা। পাঁচটি পিকআপে করে দুই-তিন শ লোক এসে জড়ো হয় রাজধানীর ইসিবি চত্বরের নিউগিনি প্রপার্টিজের মূল ফটকে। ফটক ভেঙে গুলি করতে করতে ভেতরে ঢোকে তারা। এ সময় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা-ভাঙচুর-লুটপাট চালানো হয়। পরে আশপাশের কয়েকটি বাড়িসহ স্থাপনায় ভাঙচুর করে হামলাকারীরা। পুলিশ বলছে, জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রায় ঘণ্টাব্যাপী হামলা-ভাঙচুর, লুটপাটের এক পর্যায়ে পুলিশ এলে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় গুলির শব্দ শোনা যায়। পুলিশের তুলনায় হামলাকারীরা সংখ্যায় বেশি ছিল। এ অবস্থায় পুলিশ পিছু হটে। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এ সময় পুলিশ পাঁচটি গুলি করে।
নিউগিনি প্রপার্টিজের কর্মকর্তা মো. পল্লব আলী বলেন, হামলাকারীরা পাঁচটি পিকআপে করে এসেছিল। তাদের হাতে ছিল আগ্নেয়াস্ত্র। তারা গুলি করতে করতে হাউজিংয়ের ভেতরে ঢুকে পড়ে। প্রবেশমুখের একটি বাড়ির ফ্ল্যাটে ঢুকে তারা লুটপাট করে। সেখান থেকে তারা মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জিনিস নিয়ে যায়। একপর্যায়ে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে গিয়ে হামলা-ভাঙচুর, লুটপাট চালায়। নিউগিনি প্রপার্টিজের অফিসেও হামলা করা হয়। নির্মাণশ্রমিকদের মারধর করে তাঁদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র নিয়ে যায় হামলাকারীরা।
হামলার পর রাতেই একটি ভিডিও প্রকাশ করেন সালমান মুক্তাদির। ভাঙচুর করা স্টুডিও দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘একটু আগে এখানে অ্যাটাক হয়েছিল…এই পুরা অ্যাটাকে আমাদের স্টুডিও ডেস্ট্রয়েড হয়ে গেছে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ প্রাথমিক তদন্তের বরাতে আজ রোববার দুপুরে বলেন, ‘এখানে একটা ডিসপিউটেড ল্যান্ড আছে, সম্ভবত ৩৫ কাঠার একটা ডিসপিউটেড ল্যান্ড। যেখানে জায়গাজমি নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ আছে।…এ ঘটনায় সালমান মুক্তাদির ভিকটিমাইজড (ঘটনার শিকার) হয়েছেন।’
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন রাজধানীর ভাষানটেক বস্তির বাসিন্দা মো. মামুন, মজুমদারের মোড়ের আসলাম ও মুন্না। এ ছাড়া ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকার অনিক নামের একজনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। আরেকজনের নাম জানা যায়নি।
সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওর পাশে একটি নির্মাণাধীন ভবন। কাজ শেষে ওই ভবনেই থাকেন নির্মাণশ্রমিকেরা। গুলির শব্দ শুনে ভবনের ছাদে গিয়ে হামলার ঘটনা দেখছিলেন তাঁরা। এ সময় একদল হামলাকারী তাঁদের ভবনেও যায়।
নির্মাণশ্রমিকদের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, সবাইকে ছাদ থেকে নিচে নামিয়ে এনে মারধর করে মুঠোফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয় হামলাকারীরা। তাদের হাতে দেশি অস্ত্র ছিল। কয়েকজনের হাতে পিস্তল দেখা গেছে।
জমি নিয়ে বিরোধ, স্টুডিও ভাঙচুর
দুপুরে ইসিবি চত্বর এলাকার নিউগিনি হাউজিং এলাকা পরিদর্শন করেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে, জমির দখল-বেদখলকে কেন্দ্র করে ঘটনাটি ঘটেছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আধুনিক টিনশেড বাড়ির মধ্যে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও। হামলার পর সেটি তছনছ হয়ে আছে। মেঝেতে পড়ে আছে কাচের টুকরা, ভাঙা সোফা, বাদ্যযন্ত্র, বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্র।
প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন নির্মাণশ্রমিক প্রথম আলোকে বলেন, শাটারগেট ভেঙে স্টুডিওতে ঢুকে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে ভাঙচুর চালানো হয়। পরে সেখান থেকে দামি জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায় হামলাকারীরা।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিউগিনি প্রপার্টিজের মালিক নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়া। আওয়ামী লীগ আমলে তাঁর বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ ছিল। এখন তাঁর প্রতিপক্ষ ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে সেই জমি দখলের চেষ্টা করছে।
১৩ জনকে আসামি করে মামলা
হামলার ঘটনায় ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট থানায় একটি মামলা হয়েছে। নিউগিনি প্রপার্টিজের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম ভুঁইয়া বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামলায় ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা ১৫০-২০০ জনকে আসামি করা হয়।
আসামিরা হলেন শাহরিয়া মাহমুদ (৬০), আবুল কাশেম (৫৩), বাবুল হোসেন (৪৯), মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী (৬৭), মোহাম্মদ শাহিনুজ্জামান (৪৭), মতিউর রহমান (৪৮), মজিবুর রহমান (৪৭), নুরুল ইসলাম (৫১), মিজানুর রহমান (৫৯), এম কে আজাদ (৫৪), মো. মামুন (৩২), মো. আসলাম (২৪) ও মো. মুন্না (২৯)।
মামলার এজাহারে বলা হয়, আসামিরা শটগান, রিভলবার, চাপাতি, রামদা নিয়ে নিউগিনি প্রপার্টিজে হামলা করে। এ সময় তারা আনুমানিক ৫০টি গুলি ছোড়ে। হামলায় প্রকৌশলী, নিরাপত্তাকর্মীসহ অনেকে আহত হন। এ সময় ২৫ লাখ টাকা চুরি ও লাখ লাখ টাকার জিনিসপত্র ভাঙচুর করা হয়।
নিউগিনি প্রপার্টিজের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম ভুঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের জমির পাশে মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীর কিছু জমি রয়েছে। সেই জমি তাঁর দখলে রয়েছে। তিনি বলেন, গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে হামলার নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর জমিতে যাওয়া-আসার জন্য হামলা করে একটি ফটক ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এটা পরিকল্পিত হামলা উল্লেখ করে সাইফুল ইসলাম বলেন, হামলার সময় তাঁদের আবাসন কোম্পানির অনেকগুলো সিসি ক্যামেরা, বিক্রয় কার্যালয় ভাঙচুর করা হয়। সিসি ক্যামেরার ডিভিডি খুলে নিয়ে যায় হামলাকারীরা। আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে ১৩ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
চাঁদাবাজির অভিযোগ ঢালাও: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সালমান মুক্তাদির শনিবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এই ভাঙচুরের ঘটনা নিয়ে ভিডিও প্রকাশ করেন। ডিডিওতে দেখা যায়, স্টুডিওর বিভিন্ন অংশ ভাঙচুর করা হয়েছে। চেয়ার, টেবিল, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন আসবাব ও সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্টুডিওর কর্মীদের কয়েকজনকে কাঁদতে দেখা যায়।
ভিডিওতে সালমান মুক্তাদির বলেন, স্টুডিওতে ক্লায়েন্টদের অনেক ফুটেজ ও শুটিংয়ের উপকরণ ছিল। সেগুলো হারিয়ে যাওয়ায় আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি কাজের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে। স্টুডিও ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাঁরা কাজ বন্ধ করবেন না।
সালমান মুক্তাদিরকে বলতে শোনা যায়, ‘ভিডিওটা শুধু খুবই স্পেশালি বানানো আমাদের যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, উনার জন্য। আপনি প্লিজ কোনো টেনশন নিবেন না, দিস ইজ নরমাল ইন বাংলাদেশ।’এরপর দুপুরে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মুক্তাদিরের লাইভে তোলা অভিযোগের বিষয়ে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বিএনপির বিরুদ্ধে ‘চাঁদাবাজির’ অভিযোগকে ঢালাও মন্তব্য করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘তিনি (সালমান মুক্তাদির) একপর্যায়ে বলেছেন, তাঁর কাছে কেউ চাঁদা চায়নি, চাইলে নাকি দিতেন। তো যার কাছে চাঁদা দাবি করা হয়নি, তিনি বলছেন চাইলে দিতেন। তাহলে তো চিহ্নিত কেউ নেই। এরপর তিনি বলছেন, বিএনপি চাঁদা চেয়েছে—এটি একটি ঢালাও অভিযোগ। তিনি যদি নির্দিষ্ট মামলা করেন, আমরা সেটা তদন্ত করে দেখব।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘তাঁর (সালমান মুক্তাদির) একটা স্থাপনা ছিল টিনশেডের। ওইখানে সম্ভবত বিভিন্ন কনটেন্ট ক্রিয়েশনের কাজ হতো, যেটুকু জেনেছি। ওখানেও বেশ কিছু ভাঙচুর হয়েছে, আমি এটা ভিডিওতে দেখলাম। এ বিষয়ে তাঁর পক্ষ থেকেও কোনো মামলা করা হয়নি। ফেসবুকে লাইভে এসে যে সমস্ত বক্তব্য দিয়েছেন, সেটা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর সালমান মুক্তাদির বিকেলে এক ভিডিও বার্তায় প্রশ্ন করেন, এ ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার আগপর্যন্ত এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য আসার আগপর্যন্ত মামলা কেন হলো না? তিনি লোকজন নিয়ে ভোর চারটা পর্যন্ত বসে থাকার পরও কেন মামলা করতে পারলেন না?
মুক্তাদির বলেন, তাঁকে কোনো ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না। তিনি নিজেই ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন। কিন্তু দেশের প্রত্যেক মানুষের জানমালের নিরাপত্তা সরকারকে দিতে হবে। তা না হলে দেশ বিরাটভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।



