১৯ বছরের শিক্ষকতা জীবনের অবসানশোভাযাত্রায় প্রিয় শিক্ষককে বাড়ি পৌঁছে দিলেন শিক্ষার্থীরা

আব্দুর রহমান অনিক, দর্শনা
দীর্ঘ ১৯ বছরের শিক্ষকতা জীবনের ইতি টেনে অবসরে গেলেন দর্শনা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের সহকারী সিনিয়র শিক্ষক হাফিজুর রহমান। প্রিয় শিক্ষকের বিদায়কে স্মরণীয় করে রাখতে ব্যতিক্রমী আয়োজন করেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। ফুলেল শুভেচ্ছা, উপহার ও আবেগঘন সংবর্ধনার পর চুয়াডাঙ্গা জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের গাড়িতে শোভাযাত্রা করে তাঁকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে দর্শনা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আয়োজনে বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারী ও পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেন।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, হাফিজুর রহমান ২০০৭ সালের জুন মাসে দর্শনা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। দীর্ঘ ১৯ বছর একই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করে তিনি অবসর নেন। এই সময়ে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে পাঠদান করেছেন তিনি। বিদায়ের মুহূর্তে প্রিয় শিক্ষককে ফুল ও বিভিন্ন উপহার দিয়ে শুভেচ্ছা জানান শিক্ষার্থীরা। এতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের মধ্যে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
বিদায়ী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এ কে এম হুমায়ুন কবির। প্রধান অতিথি ছিলেন চুয়াডাঙ্গা জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. আনিসুর রহমান। এ ছাড়া বিদ্যালয় পরিদর্শক আনোয়ার হোসেন, সহকারী প্রধান শিক্ষক হাসমত আলী, বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারী ও পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।
বিদায়ী বক্তব্যে হাফিজুর রহমান শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পড়াশোনা ও ভালো মানুষ হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, পড়াশোনা ঠিকমতো না করার কারণে অনেক সময় আমি তোমাদের তিরস্কার করেছি। এটা কোনো ব্যক্তিগত সন্তুষ্টির জন্য নয়। তোমাদের কল্যাণের কথা চিন্তা করেই বকাঝকা করেছি, আবার স্নেহও করেছি। তোমাদের ভালো ভবিষ্যতের জন্যই এসব করেছি। তিনি শিক্ষার্থীদের জীবনে শৃঙ্খলা, অধ্যবসায় ও শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
সংবর্ধনা শেষে শুরু হয় ব্যতিক্রমী বিদায়যাত্রা। জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. আনিসুর রহমানের গাড়িতে করে হাফিজুর রহমানকে বাড়ির উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়। গাড়ির সামনে ছিলেন শিক্ষকদের মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য যানবাহন। সঙ্গে ছিলেন জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, বিদ্যালয় পরিদর্শক আনোয়ার হোসেন, প্রধান শিক্ষক এ কে এম হুমায়ুন কবিরসহ বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। শোভাযাত্রায় অংশ নেয় পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী।
প্রায় এক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তাঁদের প্রিয় শিক্ষককে বাড়িতে পৌঁছে দেন। পুরো পথজুড়ে শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা ও উপস্থিতিতে বিদায়যাত্রা হয়ে ওঠে আবেগঘন। এ সময় অনেক শিক্ষার্থী ও সহকর্মীর চোখে পানি চলে আসে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. আনিসুর রহমান বলেন, একজন শিক্ষককে সম্মান জানাতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের এমন আয়োজন প্রশংসনীয়। এ ধরনের উদ্যোগ শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের গভীরতা প্রকাশ করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে অনুপ্রাণিত করবে।
দীর্ঘ ১৯ বছরের কর্মজীবন শেষে বিদ্যালয় থেকে বিদায় নিলেও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে হাফিজুর রহমানের সম্পর্কের স্মৃতি থেকে যাবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায় আয়োজিত এই ব্যতিক্রমী বিদায়যাত্রা দর্শনা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের স্মরণীয় একটি ঘটনা হয়ে থাকবে।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।