আন্তর্জাতিক যুব দিবস: সভ্যতাবান্ধব কর্মপরিকল্পনায় তারুণ্যের অন্তর্ভুক্তি – উন্নয়নের নতুন দিগন্ত !

কৃষিবিদ মনিরুজ্জামান বাবুল

১২ আগস্ট আন্তর্জাতিক যুব দিবস। তরুণদের সম্ভাবনা, অধিকার, অংশগ্রহণ ও ভবিষ্যৎ নির্মাণে তাদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ভাবার দিন এটি। বাংলাদেশের বাস্তবতায় যুবসমাজ মোট জনসংখ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ; তারা অর্থনীতি, সমাজ ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের সবচেয়ে সক্রিয় শক্তিগুলোর একটি। তাই তারুণ্যকে নিয়ে এখন প্রয়োজন কথিত স্লোগানে বন্দিত্ব নয়, প্রয়োজন
যুগোপযোগী, সৃজনশীল কর্মযজ্ঞ! অধিকন্তু মানবিক ও সভ্যতাবান্ধব কর্মপরিকল্পনা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সুমনের মর্মান্তিক ঘটনাটি আমাদের সামনে একটি গভীর মানবিক প্রশ্নও রেখে যায়। একজন তরুণ যখন জীবনের কোনো সংকটকে অসহনীয় মনে করেন, তখন বুঝতে হয়—শুধু শিক্ষাগত সাফল্য, চাকরি কিংবা প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়! তরুণদের এমন একটি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ প্রয়োজন, যেখানে তারা স্বপ্ন দেখবে, আত্ম-জিজ্ঞাসায় ফলশ্রুতিতে উদ্যোগ নেবে এবং সংকটে পড়লে সহায়তার হাতও পাবে। যুব উন্নয়ন তাই শুধু অর্থনৈতিক কর্মসূচি নয়; এটি মানবিক সমাজ নির্মাণেরও প্রকল্প।

বর্তমান বিশ্ব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, অটোমেশন, সবুজ অর্থনীতি ও নতুন উদ্যোক্তা সংস্কৃতি কর্মজগতের প্রচলিত ধারণাকে পাল্টে দিচ্ছে। ফলে তরুণদের প্রশিক্ষণও হতে হবে প্রযুক্তিনির্ভর, ব্যবহারিক ও বাজারমুখী। শুধু সনদ নয়—প্রশিক্ষণের লক্ষ্য হওয়া উচিত জ্ঞান, দক্ষতা, উদ্ভাবন ও কর্মসৃষ্টির সক্ষমতা।

এই পরিবর্তনের সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবাও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। করোনা-পরবর্তী বিশ্বে প্রযুক্তিনির্ভর ও আন্তঃদেশীয় স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। দক্ষ চিকিৎসক, নার্স, ফিজিওথেরাপিস্ট, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, কেয়ারগিভারসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবী আজ শুধু কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র নন; তাঁরা জনস্বাস্থ্য ও মানবিক সভ্যতার স্থিতিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই যুব দক্ষতা উন্নয়নে স্বাস্থ্যসেবা ও কেয়ার ইকোনমি-কে অগ্রাধিকার দেওয়া সময়ের দাবি। এ খাতে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ তরুণদের দেশীয় কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বৈশ্বিক শ্রমবাজারেও দক্ষ জনশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
একথা স্বীকার্য যাবতীয় সকল কর্মসূচির নেপথ্যে একটি মানবিক মুল্যবোধের অদৃশ্য জাগরণ হবে বন্ধনের আদি স্বীকৃতি!

উদ্যোক্তা উন্নয়ন নিশ্চয় কেবল ব্যবসাবান্ধব হবে তবে তদীয় সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ নয়।
কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষিপণ্য বিপণন, কৃষি-প্রযুক্তি, পর্যটন, বিউটিফিকেশন, ডিজিটাল সেবা, হস্তশিল্প ও স্থানীয় সম্পদভিত্তিক উদ্যোগপ্রতিটি ক্ষেত্রেই তরুণদের নতুন সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষি উদ্যোক্তা উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের মতো উদ্যোগ প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, পরামর্শ, অর্থায়ন ও বাজারসংযোগের সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে পারে।

এক্ষেত্রে প্রয়োজন অঞ্চলভিত্তিক দক্ষতা বিকেন্দ্রীকরণ। রাজশাহীতে কৃষি ও খাদ্যপ্রক্রিয়াজাতকরণ, বরেন্দ্র ও দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল চুয়াডাঙ্গা যশোর এলাকায় খরা প্রবন এলাকায় পানি-সাশ্রয়ী ও জলবায়ুস্মার্ট কৃষি, উপকূলে জলবায়ুসহিষ্ণু কৃষি ও মৎস্য, পাহাড়ি অঞ্চলে কৃষি-পর্যটন ও হস্তশিল্প স্থানীয় সম্পদ, সংস্কৃতি ও বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রশিক্ষণ ও উদ্যোক্তা কর্মসূচি গড়ে তুললে তা হবে অধিক কার্যকর ও টেকসই।

আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত তরুণকে শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, সমস্যা সমাধানকারী, উদ্ভাবক ও পরিবর্তনের অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলা। শিক্ষা, প্রযুক্তি, দক্ষতা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক সুস্থতা, নাগরিক দায়িত্ব ও সামাজিক উদ্ভাবন—সবকিছুকে একটি সমন্বিত যুব কর্মপরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।

আন্তর্জাতিক যুব দিবস তাই নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি নতুনভাবে আজকের উন্নয়ন ও পরিবর্তনের নেতৃত্বে যুক্ত করতে হবে।

কারণ সঠিক দিকনির্দেশনা, দক্ষতা ও সুযোগ পেলে একজন তরুণ শুধু নিজের জীবন বদলায় না—একটি পরিবার, একটি অঞ্চল, এমনকি একটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক গতিপথও বদলে দিতে পারে।

তারুণ্যে বিনিয়োগ মানে শুধু কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ নয়; এটি মানবিক, দক্ষ, প্রযুক্তিসমৃদ্ধ ও সভ্যতাবান্ধব ভবিষ্যতে বিনিয়োগ।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।