জীবননগর অফিস
একদিকে চিকিৎসা সেবার জন্য হাহাকার, অন্যদিকে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক ভবনে বছরের পর বছর তালা ঝুলছে—এমনই চিত্র চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। শয্যা সংকটে বারান্দা, করিডোর এমনকি মেঝেতেও চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন রোগীরা। অথচ হাসপাতাল চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকা ৫০ শয্যার আধুনিক ভবনটি এখনও ব্যবহারের অপেক্ষায়।
বর্তমানে ৩১ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন ভর্তি থাকেন প্রায় ৫০ থেকে ৭০ জন রোগী। বহির্বিভাগে গড়ে ৫০০ জনেরও বেশি মানুষ চিকিৎসা নিতে আসেন প্রতিদিন। অতিরিক্ত রোগীর চাপে হাসপাতাল কার্যত নাজেহাল অবস্থায় পড়েছে। নেই পর্যাপ্ত বেড, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও সেবিকা, পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবও প্রকট।
নৈশ প্রহরী থাকা সত্ত্বেও হাসপাতালের বিভিন্ন সরঞ্জাম চুরির ঘটনা প্রায়ই ঘটে।তাছাড়াও রোগী ও রোগীর স্বজনদের পানির জন্য পর্যাপ্ত নলকূপের ব্যবস্থা নেই।
জানা গেছে, স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ২০১৭ সালের ৪ এপ্রিল শুরু হয় চারতলা বিশিষ্ট একটি আধুনিক ভবনের নির্মাণকাজ। প্রায় ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার প্রকল্পটি ২০২২ সালের শেষ দিকে সম্পন্ন হয়। ভবনটিতে রয়েছে ৫০ শয্যার ব্যবস্থা, আধুনিক কেবিন, লিফট, উন্নত স্যানিটেশন এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো।
কিন্তু নির্মাণ শেষ হওয়ার তিন বছর পরও সেখানে শুরু হয়নি চিকিৎসা কার্যক্রম। ব্যবহারের অভাবে ভবনের লিফটে জং ধরছে, যন্ত্রপাতি অচল হয়ে পড়ছে, দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে, নষ্ট হয়ে গেছে এসি। জানালা-দরজাও ভাঙচুরের শিকার হয়েছে। এমনকি ফাঁকা ভবনে বেড়েছে মাদকসেবীদের আনাগোনাও। হাসপাতালের করিডোরে বসে থাকা রোগী ও স্বজনদের কষ্টের শেষ নেই।
রোগী রুজিফা বেগম বলেন, তিন দিন ধরে মেঝেতে শুয়ে আছি। একদিন ডাক্তার দেখেছেন, এরপর আর কেউ খোঁজ নেয়নি। চারপাশে দুর্গন্ধ, গরমে থাকা যায় না।
বহির্বিভাগে আসা লোকমান মিয়া জানান, সকাল ৮টায় লাইনে দাঁড়িয়েছি, এখন সাড়ে ১১টা—তবুও ডাক্তার দেখাতে পারিনি। এত ভিড় যে সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে যাবে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শ্যামল কুমার পাল জানান, হাসপাতালটি ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় নতুন ভবন চালু করা যাচ্ছে না। প্রতিদিন অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলানো খুবই কঠিন হয়ে পড়ছে।
স্থানীয় সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষের প্রশ্ন যদি ভবন প্রস্তুত রেখেও ব্যবহার না করা হয়, তবে এত অর্থ ব্যয়ের উদ্দেশ্য কী? এটি কি শুধুই জনবল সংকট, নাকি প্রশাসনিক গাফিলতি?
পৌরসভার বাসিন্দা ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম বলেন,একদিকে মানুষ চিকিৎসা না পেয়ে কষ্ট পাচ্ছে, অন্যদিকে আধুনিক ভবন খালি পড়ে আছে। সরকার কাজ করেছে, কিন্তু ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ব্যর্থতা আছে।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত নতুন ভবনটি চালু করে সেখানে রোগী স্থানান্তর এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগ দিতে হবে। তাদের মতে, এটি শুধু একটি হাসপাতালের সংকট নয়—এটি পুরো এলাকার লাখো মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়।
স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। কোটি টাকার অবকাঠামো যদি ব্যবহারের অভাবে অচল হয়ে পড়ে, তবে তা শুধু অপচয়ই নয়—এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। তাই দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণই এখন সময়ের দাবি।
৪ বছরেও চালু হয়নি জীবননগর হাসপাতালের নব নির্মিত ভবন শয্যা সংকটে মেঝেতে চিকিৎসা, সাধারণ রোগীদের দুর্ভোগ চরমে



