আধুনিকতার দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি

সরোজগঞ্জ প্রতিনিধি
আধুনিক যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশ্ব এগিয়ে চলেছে দ্রুতগতিতে। প্রযুক্তি ও যান্ত্রিকতার ছোঁয়ায় বদলে গেছে মানুষের জীবনযাপন পদ্ধতি। এরই ধারাবাহিকতায় গ্রামবাংলার বহু ঐতিহ্যবাহী কৃষি ও গৃহস্থালি সামগ্রী আজ বিলুপ্তির পথে। প্রগতি ও আধুনিকতার এই যুগে মানুষ এখন স্বল্প সময়ে, স্বল্প শ্রমে কাজ সম্পন্ন করতে আগ্রহী। ফলে একসময়কার অপরিহার্য অনেক উপকরণই হারিয়ে যাচ্ছে কালের গর্ভে।
গ্রাম বাংলার কৃষক-কৃষাণীদের কাছে ভালো মানের চাল তৈরির প্রধান মাধ্যম ছিল কাঠের তৈরি ঢেঁকি। ঢেঁকির ছন্দময় শব্দ একসময় গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। কিন্তু বর্তমানে যান্ত্রিক মিল ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাবে সেই পরিচিত শব্দ আজ প্রায় নিস্তব্ধ।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলাসহ দেশের বিভিন্ন গ্রামে ঢেঁকি এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। হাতে গোনা দু-একটি কৃষক পরিবারে এখনও কাঠের তৈরি প্রাচীন ঢেঁকি চোখে পড়ে। ধান, চাল, আটা ও চিড়া ভাঙানোর জন্য বৈদ্যুতিক মিল সহজলভ্য হওয়ায় গ্রামীণ মানুষ অল্প সময়ে ও কম খরচে প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করতে পারছেন। ফলে ঢেঁকির ব্যবহার দিন দিন কমে গেছে।
তবে শীত মৌসুমে পিঠা-পুলির আয়োজন ঘিরে এখনও কোথাও কোথাও ঢেঁকির ব্যবহার দেখা যায়। বিশেষ করে পৌষ মাসে আত্মীয়-স্বজনদের আপ্যায়নে গ্রামীণ পরিবারগুলো ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঢেঁকিতে চাল ভেনে আটা প্রস্তুত করেন। এতে এক ধরনের নস্টালজিয়া ও উৎসবের আবহ তৈরি হয়।
ঢেঁকিতে কাজের প্রক্রিয়াও ছিল দলগত ও পরিশ্রমসাধ্য। বিশাল ওজনের ঢেঁকিতে সাধারণত দুই থেকে তিনজন একসঙ্গে পাড় দিতেন। দুজন একই ছন্দে পা দিয়ে ঢেঁকি চালাতেন, আরেকজন হাত বা লাঠির সাহায্যে গর্তে থাকা ধান বা চাল নেড়ে দিতেন, যাতে নিচের ধান ওপরে উঠে আসে এবং সমানভাবে ভাঙে। অনেক সময় লম্বা হাতলের মাথায় নারিকেলের খোল বেঁধে ধান নেড়ে দেওয়া হতো। কিছুক্ষণ পর পর খোঁড়ল থেকে চাল বা ধান তুলে কুলায় ঝাড়া কিংবা চালুনি দিয়ে চেলে আবার খোঁড়লে ঢেলে দেওয়া হতো। এভাবে চার থেকে পাঁচজনের একটি দল পালাক্রমে কাজ সম্পন্ন করতেন।
গ্রামীণ সমাজব্যবস্থায় ঢেঁকি শুধু একটি কৃষিযন্ত্রই ছিল না, এটি ছিল পারস্পরিক সহযোগিতা, মিলনমেলা ও সংস্কৃতির অংশ। আধুনিকতার জোয়ারে সেই ঐতিহ্য আজ বিলীন হওয়ার পথে। সচেতন মহলের মতে, গ্রামবাংলার ঐতিহ্য সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো ঢেঁকির নামই কেবল বইয়ের পাতায় খুঁজে পাবে।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।