চুয়াডাঙ্গায় রমজানকে সামনে রেখে বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়

স্টাফ রিপোর্টার
পবিত্র রমজানকে সামনে রেখে চুয়াডাঙ্গার কাঁচাবাজার ও নিত্যপণ্যের দোকানে হঠাৎ করেই বেড়েছে দ্রব্যমূল্য। অনেক পণ্যের দাম প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। অন্যদিকে, রোজার প্রস্তুতিতে বাজারে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। সকল সবজির যেন দাম বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। একটি দেশীয় কাগজি লেবু বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকায়, শসার দামও সেঞ্চুরি হাকিয়েছে। প্রতিবছরই পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে চুয়াডাঙ্গাসহ সারা দেশের বাজারের নিত্যপণ্যের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। দ্রব্যমূল্যের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে ক্রেতাদের অধিক চাহিদা এবং বাজারে পণ্যের যোগান কম থাকাকেই দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে শহরের বড় বাজার ও নিচের বাজার ঘুরে দেখা যায়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে মানুষের ঢল নেমেছে। বিশেষ করে মুদি ও সবজির দোকানে ছিল অতিরিক্ত ভিড়। ক্রেতারা আগেভাগেই ইফতার ও সেহরির সামগ্রী সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন। পবিত্র মাহে রমজানের সারা মাসের বাজার এক দিনেই করতে এসেছেন অনেক ক্রেতারা। যার ফলে বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি এবং যোগান কমায় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিচের বাজারের মুদি দোকান গুলো পরিদর্শন করে দেখা যায়, বর্তমানে খেজুর মানভেদে প্রতি কেজি ২০০ থেকে ১২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ছোলা ৮৫ টাকা, বেসন ৯৫ টাকা, মুড়ি ৯০ টাকা, সয়াবিন তেল ১৯৬ টাকা, চিনি ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। যা গত বছরের তুলনায় খুব একটা বেশি বাড়েনি বলে জানাচ্ছেন ক্রেতারা।
এদিকে আপেল, কমলা ও আঙ্গুরসহ অন্যান্য ফলের দাম মোটামুটি স্থিতিশীল আছে বলে অনেক ক্রেতার অভিমত। কলা প্রকারভেদে ১৫ থেকে ২০ টাকা হালি বিক্রি হচ্ছে।
সবজির বাজারে কোন সবজির দামই যেন থেমে নেই। কয়েক দিনের ব্যবধানে কিছু সবজির দাম বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। কয়েক সপ্তাহ আগেও শসা ছিল ৫০ টাকা, বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ১২০ টাকা। বেগুন ৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৬০ টাকা, টমেটো ৪০ টাকা থেকে ৬০ টাকা, লেবু ৩০ টাকা থেকে বেড়ে ৬০ থেকে ১২০ টাকা হালি, পেঁয়াজ ৩৫ টাকা থেকে ৫০ টাকা, রসুন ১০০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা এবং কাঁচা মরিচ ৮০ টাকা থেকে বেড়ে ১৮০ টাকা, আলু ২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। কাঁচা বাজারের দ্রব্যমূল্য এমন অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে ক্রেতাদের মাঝে দেখা গেছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। হঠাৎ পন্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ক্রেতারা। আবার অনেকে দাম আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় একদিনেই এক মাসের বাজার করে নিচ্ছেন।
বিক্রেতারা জানান, রমজানকে ঘিরে পন্যের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং সরবরাহ কিছুটা কম থাকায় দাম বেড়েছে। তাদের দাবি, পাইকারি বাজারেই পণ্যের দাম বেশি থাকায় খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়ছে। এছাড়া পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আমদানিনির্ভর পণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতিও বাজার অস্থিরতার কারণ বলে জানান তারা।
অন্যদিকে, ক্রেতারা বলছেন, হঠাৎ করেই সবজির দাম বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে রমজানের বাজার সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। একাধিক ক্রেতার অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত লাভের আশায় দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন।
খুচরা সবজি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শিপন বলেন, রমজানের আগে সবজির দাম তুলনামূলক কম থাকায় বিক্রি ভালো ছিল। কিন্তু রোজা উপলক্ষে বাজারে সবজির দাম বেড়ে যাওয়ায় আমাদের বিক্রি কমে গেছে। আগে কাঁচা মরিচ প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি করা হলেও বর্তমানে তা ১৮০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। পাইকারি বাজার থেকেই বেশি দামে পণ্য কিনতে হওয়ায় বাধ্য হয়ে খুচরা বাজারেও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। পণ্যের দাম কম থাকলে ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ে এবং বিক্রিও ভালো হয়।
পাইকারি সবজি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শামীম রেজা বলেন, রমজানকে কেন্দ্র করে বাজারে সবজির চাহিদা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। বিশেষ করে কাঁচা মরিচ, শসা, টমেটো, বেগুন ও লেবুর চাহিদা বেশি থাকায় পাইকারি বাজারেই দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের সবজি মোকাম থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। আমরা বেশি দামে কিনলে স্বাভাবিকভাবেই খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছেও বেশি দামে বিক্রি করতে হয়।
মুদি দোকানী মোসলেম হোসেন বলেন, রমজান উপলক্ষে মুদি দোকানের পণ্যের দাম খুব একটা বাড়েনি। গতবছর রমজান মাসের তুলনায় এ বছর পণ্যের দাম বরং কিছুটা কম। গত বছর ছোলা ১১০ টাকা কেজি বিক্রি হলেও এ বছর বিক্রি হচ্ছে ৮৫ টাকা কেজি। গত বছর চিনি ১৩০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে এ বছর ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে সাধারণ ক্রেতারা একদিনে ১ মাসের বাজার করাতে পন্যের যোগান কমছে।
ক্রেতা আবুল কালাম আজাদ বলেন, রমজান উপলক্ষে সবজির দাম বেশি। প্রতি বছর রমজান আসলেই বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যায়, বিশেষ করে সবজির দাম। সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাই। আগে যে সবজি ৪০-৫০ টাকায় কিনতাম, এখন সেটাই ৮০-১০০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। রোজার মাসে খরচ এমনিতেই বেশি থাকে, তার ওপর যদি সবজির দাম বাড়ে, তাহলে অনেকেই প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে হিমশিম খাবে।
কাঁচামাল আড়ৎ সমিতির উপদেষ্টা মোহাম্মদ ফয়জুল ইসলাম ফজু বলেন, পবিত্র মাহে রমজানকে সামনে রেখে বাজারে সবজির চাহিদা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু সেই অনুপাতে বাজারে পর্যাপ্ত যোগান নেই। বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারনে পাইকারি পর্যায়ে সরবরাহ সংকটের কারণে বাজারে পণ্যের চাপ তৈরি হয়েছে। আমরা ব্যবসায়ীরা ইচ্ছাকৃতভাবে দাম বাড়াই না। চাহিদা বেশি আর সরবরাহ কম থাকলে স্বাভাবিকভাবেই দামের ওপর প্রভাব পড়ে। বর্তমানে অনেক সবজি আমাদের বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, তাই খুচরা বাজারেও তার প্রভাব পড়ছে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এবং পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত হলে দামও ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হয়ে আসবে।
এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা বাজার মনিটরিং কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম বলেন, রমজানকে কেন্দ্র করে বাজার মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে। সারা দেশের ন্যায় চুয়াডাঙ্গাতেও কিছু সবজির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে স্থিতিশীল আছে মুদি দোকানের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য। ক্রেতারা এক দিনেই সারা মাসের বাজার করায় বাজারে পন্যের চাহিদা বেড়েছে। তবে কিছুদিন গেলে সবজির দাম একটু কমবে বলে ধারণা করছি। জনসাধারণের সুবিধার্থে নিয়মিত বাজার মনিটরিং অব্যাহত থাকবে। প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণে আনাবে এমনটাই দাবি সাধারন ক্রেতাদের। যাতে পবিত্র মাহে রমজানে স্বস্তিতে ইফতার ও সেহরির আয়োজন করতে পারেন।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।