কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি:
কপোতাক্ষ নদের তীরে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর শহরের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা হলুদ রঙের দোতলা ভবনটি যেন ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী। বয়স ১২৬ বছর। সময়ের পরিক্রমায় ভবনটি দেখেছে বহু পরিবর্তন, বহন করছে অসংখ্য স্মৃতি। স্থানীয়ভাবে ভবনটি ‘ঊষা রানী ভবন’ নামেও পরিচিত। একসময় ঊষা রানী এই ভবনে বসবাস করতেন। পরবর্তী সময়ে এটি হয়ে ওঠে কোটচাঁদপুরের শিক্ষা বিস্তারের অন্যতম ঐতিহাসিক কেন্দ্র। ১৮৯৯ সালে ‘কোটচাঁদপুর উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়’ নামে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। সে সময় ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সমৃদ্ধ কোটচাঁদপুরকে অনেকে ‘ছোট কলকাতা’ বলে অভিহিত করতেন।
তৎকালীন পৌরসভার চেয়ারম্যান এডওয়ার্ড জর্জ ম্যাকলাউড, মি. বি. অ্যালেন ও জে. জে. প্ল্যাটেলসহ কয়েকজন উদ্যোগী ব্যক্তি এলাকায় একটি মানসম্মত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তাঁদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি ১৯০১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি লাভ করে। তবে হলুদ ভবনটির ইতিহাস বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠারও আগে থেকে শুরু। ভবনটি প্রথমে বিদ্যালয় ছিল না। স্কটল্যান্ডের বাসিন্দা হ্যারল্ড ক্লাইভ ম্যাকলাউডের ১১ দশমিক ৩৩ একর জমির ওপর নির্মিত একটি বাংলো বাড়ি ছিল এটি। দেশভাগের আগে তিনি সম্পত্তিটি বিক্রি করে চলে যান। পরবর্তী সময়ে সম্পত্তির মালিকানা ঊষা রানীর হাতে আসে। একসময় তিনি এই ভবনে বসবাস করতেন। পরে বিনিময় সূত্রে সম্পত্তিটির মালিক হন মোহাম্মদ আশরাফ আলী। তিনি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য পুরো সম্পত্তি দান করেন। এরপর থেকেই ভবনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এই ভবন শুধু শিক্ষার্থীদের পাঠদানের স্থান হিসেবেই নয়, কোটচাঁদপুরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও অংশ হয়ে রয়েছে। এখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে বহু শিক্ষার্থী শিক্ষক, চিকিৎসক, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তবে কালের বিবর্তনে ভবনটির সৌন্দর্য ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও জানালার কাঠ নষ্ট হয়েছে, কোথাও দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে। একসময় যে ভবন ছিল আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের প্রতীক, সময়ের সঙ্গে তার জৌলুস অনেকটাই ম্লান হয়েছে। তবুও ভবনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব আজও অমলিন। ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠানটি সরকারিকরণ করা হয়। বর্তমানে এর নাম কোটচাঁদপুর সরকারি মডেল পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠানটি অর্জন করে ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যাওয়ার্ড।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ভবনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে মূল স্থাপত্যশৈলী অক্ষুণ্ন রেখে যথাযথ সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। ভবনটির পুরোনো হলুদ রং, নান্দনিক নকশা ও ঐতিহ্যবাহী সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনা গেলে এটি কোটচাঁদপুরের অন্যতম ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থানে পরিণত হতে পারে।



