স্টাফ রিপোর্টার
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাম্য, মানবতা, প্রেম, বিদ্রোহ ও সৃষ্টিশীলতার চেতনাকে নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চুয়াডাঙ্গায় চলছে সাত দিনব্যাপী নজরুল উৎসব। উৎসবের চতুর্থ দিনেও সংগীত, আবৃত্তি ও নাট্য পরিবেশনায় মুখর হয়ে ওঠে জেলা শিল্পকলা একাডেমির মুক্তমঞ্চ। কবির কালজয়ী সৃষ্টি, জীবনদর্শন ও সাহিত্যকর্মের পরিবেশনায় মুগ্ধ হন দর্শক-শ্রোতারা। উৎসবের পঞ্চম দিনে আজ বৃহস্পতিবার মঞ্চস্থ হবে কাজী নজরুল ইসলামের গল্প অবলম্বনে নাটক ‘রিক্তের বেদন’।
এদিকে, আগামী ৩১ অক্টোবর উৎসবের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর। ‘জাগো নব সৃষ্টির মহানন্দে’ প্রতিপাদ্যে চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিষদের আয়োজনে গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় জেলা শিল্পকলা একাডেমির মুক্তমঞ্চে নজরুল উৎসবের চতুর্থ দিনের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এতে চুয়াডাঙ্গা আবৃত্তি পরিষদের পরিবেশনায় ‘ছোটদের চোখে আমাদের নজরুল’ শীর্ষক আবৃত্তি অনুষ্ঠান এবং সংলাপ সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর পরিবেশনায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের রচিত নাটক ‘ঈদুল ফেতর’ মঞ্চস্থ হয়।
আবৃত্তি ও নাট্য পরিবেশনার মধ্যদিয়ে কবির সাহিত্যকর্মের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে নজরুলের রচনায় মানবিকতা, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা ও শোষিত মানুষের অধিকারের যে বার্তা রয়েছে, তা পরিবেশনার মধ্যদিয়ে দর্শকদের সামনে তুলে ধরেন শিল্পীরা। শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে আবৃত্তি অনুষ্ঠানটি উৎসবে যোগ করে ভিন্নমাত্রা। অন্যদিকে ‘ঈদুল ফেতর’ নাটকের পরিবেশনা দর্শকদের মধ্যে সৃষ্টি করে বাড়তি আগ্রহ।
চতুর্থ দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল সংলাপ সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর নাটক ‘ঈদুল ফেতর’। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের রচিত নাটকটি নির্দেশনা দেন নজীর আহমেদ। নাটকটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেন সাইফুল ইসলাম, আব্দুল কাদের জিলানী, আলিহিম, শাওয়াল সিদ্দিক শাফা আদ, ভবেশ কর্মকার, আশরাফুল ইসলাম মিঠুন, মো. মনির হোসেন, শহিদা বেগম ও সাবানা খাতুন।
এছাড়া অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেন আহ্বান খান, আশরাফ আলী, মনিরুজ্জামান, জবেদা বেগম, ইভা ও বিজয়া। নাটকটির আবহসংগীতে ছিলেন আব্দুল হামিদ, আলোক পরিকল্পনায় নুর আলম সিদ্দিক এবং পোশাক পরিকল্পনায় শাহিদ হাসান জোয়ারদার সোনা। সংলাপ সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর শিল্পীদের পরিবেশনায় নাটকটি উপভোগ করেন উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা।
চুয়াডাঙ্গা আবৃত্তি পরিষদের আয়োজনে ‘ছোটদের চোখে আমাদের নজরুল’ শীর্ষক আবৃত্তি অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন মনোয়ারা খুশী। এতে অংশ নেয় শিশু-কিশোর আবৃত্তিশিল্পীরা। অংশগ্রহণকারীরা হলো আপন, মাহিয়া, সাদিয়া, সাবা, রাইয়ান, মাশকুরা, নিহান, আলিজা, ইসরাক, রাইসা, হুমায়রা, আমিমা, আফরা, অরনি, নুসাইবা ও আবিয়াত। শিশু-কিশোরদের কণ্ঠে নজরুলের সাহিত্য ও চেতনাভিত্তিক পরিবেশনা উৎসবের সাংস্কৃতিক আবহকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে জাতীয় কবির সাহিত্য, আদর্শ ও সৃষ্টিকর্মের প্রতি আগ্রহ তৈরি করাই এ ধরনের আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. শরীফুজ্জামান শরীফ। তিনি বলেন, সাত দিনব্যাপী এই উৎসবে জেলার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও শিল্পীরা অংশ নিচ্ছেন। তাঁদের পরিবেশনা, দক্ষতা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড উৎসবকে সমৃদ্ধ করছে। প্রতিটি সংগঠন নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী ভালো পরিবেশনা উপহার দেওয়ার চেষ্টা করছে।
তিনি আরও বলেন, নজরুল উৎসব কেবল একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়; এটি জাতীয় কবির সাহিত্য, দর্শন, মানবিকতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পীরা নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরার সুযোগ পান এবং নতুন প্রজন্ম দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে আরও গভীরভাবে পরিচিত হতে পারে।
শরীফুজ্জামান শরীফ বলেন, উৎসবের সমাপনী দিন ৩১ অক্টোবর। ওই দিনের অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। তাই সমাপনী অনুষ্ঠানকে ঘিরে জেলার সাংস্কৃতিক সংগঠন ও শিল্পীদের আরও ভালো প্রস্তুতি নিতে হবে। চুয়াডাঙ্গার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও শিল্পীদের সক্ষমতা তুলে ধরতে সেদিন জেলার সেরা পরিবেশনা উপহার দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুকুল কুমার মৈত্রী, পৌর বিএনপির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম মনি, জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার সাইফুল হাসান মিলন, চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সভাপতি নাজমুল হক স্বপন, জেলা কৃষক দলের সদস্যসচিব ও বাড়াদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তোবারক হোসেন, জেলা জাসাসের সভাপতি শহিদুল হক বিশ্বাস, সাধারণ সম্পাদক সেলিমুল হাবিব সেলিম, সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হুসাইন মালিক, দামুড়হুদা উপজেলা জাসাসের সভাপতি আক্কাস আলী এবং অরিন্দম সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হিরন উর রশীদ শান্তসহ সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন জেলা শিল্পকলা একাডেমির প্রশিক্ষক সৌম্যজিতা শ্রুতি।
উৎসবের পঞ্চম দিনে আজ বৃহস্পতিবার মঞ্চস্থ হবে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গল্প অবলম্বনে নাটক ‘রিক্তের বেদন’। আলমডাঙ্গা কলাকেন্দ্রের সাংস্কৃতিক আয়োজনের পাশাপাশি অরিন্দম সাংস্কৃতিক সংগঠন নাটকটি পরিবেশন করবে। গল্পটির নাট্যরূপ দিয়েছেন বজলুর রহমান জোয়ারদার এবং নির্দেশনায় রয়েছেন হিরন উর রশীদ শান্ত।
নজরুলের সাহিত্যকর্মের নাট্যরূপ মঞ্চে উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে দর্শকদের সামনে কবির সৃষ্টিশীলতার আরেকটি দিক তুলে ধরার প্রস্তুতি নিয়েছেন আয়োজকেরা। গল্পের বিষয়বস্তু, চরিত্র ও আবেগকে নাট্য পরিবেশনার মাধ্যমে দর্শকদের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এ আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ। সাত দিনব্যাপী এ উৎসবে জেলার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন পর্যায়ক্রমে সংগীত, আবৃত্তি ও নাট্য পরিবেশনায় অংশ নিচ্ছে। আগামী ৩১ অক্টোবর সমাপনী আয়োজনের মধ্যদিয়ে শেষ হবে নজরুল উৎসব। সমাপনী অনুষ্ঠান ঘিরে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কর্মী, শিল্পী ও দর্শকদের মধ্যে বাড়তি প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।



