“নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ”

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস আমাদের সামনে কেবল সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধের আহ্বানই তুলে ধরে না; বরং রাষ্ট্রের উন্নয়নদর্শন, নাগরিকের জীবনের মর্যাদা এবং জনস্বার্থ রক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নটিকেও নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। এবারের প্রতিপাদ্য “নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ” একটি আনুষ্ঠানিক স্লোগানের চেয়ে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। এটি এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয়, যেখানে উন্নয়নের সুফল মানুষের জীবনে নিরাপত্তা, স্বস্তি ও সম্ভাবনার বাস্তব রূপ হিসেবে প্রতিফলিত হবে।
উন্নয়নের সার্থকতা কেবল অবকাঠামোর বিস্তৃতি কিংবা যানবাহনের গতিশীলতায় পরিমাপ করা যায় না; এর প্রকৃত মূল্যায়ন নির্ভর করে মানুষের জীবন কতটা নিরাপদ, সুরক্ষিত ও মর্যাদাপূর্ণ হচ্ছে তার ওপর। যে সড়কে প্রতিনিয়ত মানুষের জীবন বিপন্ন হয়, সেই সড়কের উন্নয়নকে পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। অতএব, নিরাপদ সড়কব্যবস্থা কোনো বিচ্ছিন্ন পরিবহনগত বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং সুশাসনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ।

সড়ক নিরাপত্তা: একটি সমন্বিত জাতীয় দায়িত্ব

সড়ক কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়; এটি দেশের কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও পণ্য সরবরাহব্যবস্থার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এই ব্যবস্থার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত পরিবহন মালিক, চালক ও শ্রমিকেরা। তাঁদের শ্রমের মাধ্যমে কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছায়, শিল্পের উৎপাদন সচল থাকে এবং দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল হয়। ফলে পরিবহন ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে জাতীয় অর্থনীতির ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করা। সড়ক দুর্ঘটনাকে কেবল চালকের ভুল, যানবাহনের ত্রুটি কিংবা সড়কের অব্যবস্থাপনার বিচ্ছিন্ন ফল হিসেবে দেখলে সমস্যার প্রকৃত স্বরূপ অনুধাবন করা সম্ভব নয়। দুর্ঘটনার পেছনে চালকের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা, যানবাহনের যান্ত্রিক অবস্থা, সড়কের নকশা, গতিনিয়ন্ত্রণ, কর্মঘণ্টা, বিশ্রামের সুযোগ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং আইন প্রয়োগের কার্যকারিতাসহ বিভিন্ন উপাদান ভূমিকা রাখতে পারে। তাই দুর্ঘটনা-পরবর্তী দায় নির্ধারণের পাশাপাশি দুর্ঘটনার পূর্ববর্তী ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রশমনের সক্ষমতা গড়ে তোলাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের অন্যতম অগ্রাধিকার।
আধুনিক সড়ক নিরাপত্তার মৌলিক দর্শন হলো মানুষের ভুলের সম্ভাবনা থাকবে, কিন্তু সেই ভুলের পরিণতি যেন অনিবার্যভাবে মৃত্যু বা স্থায়ী পঙ্গুত্বে পর্যবসিত না হয়। এ দর্শনের বাস্তবায়নে প্রয়োজন নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো, নিয়ন্ত্রিত গতি, উপযুক্ত ও ত্রুটিমুক্ত যানবাহন, প্রশিক্ষিত চালক, দায়িত্বশীল সড়ক ব্যবহারকারী, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা জরুরি চালকের পেশাগত দায়িত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই, কিন্তু সড়ক নিরাপত্তার সমগ্র দায় এককভাবে চালকের ওপর চাপিয়ে দেওয়াও ন্যায়সংগত নয়। চালকের দক্ষতা ও বৈধ লাইসেন্সের পাশাপাশি তাঁর কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ন্যায্য কর্মপরিবেশ, যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণ এবং সড়ক ব্যবস্থাপনার মানও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

অননুমোদিত যানবাহন নিয়ন্ত্রণে বাস্তবসম্মত নীতির প্রয়োজন

দেশের বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়কে আলমসাধু, নসিমন, করিমন, ভটভটি, লাটা হাম্বারসহ বিভিন্ন অননুমোদিত বা সংশ্লিষ্ট সড়কে চলাচলের উপযোগিতা ও অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এমন যানবাহনের চলাচল সড়ক নিরাপত্তা ও পরিবহন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। এ বিষয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা জরুরি। গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকার সঙ্গে এসব যানবাহনের বাস্তব সম্পর্ক রয়েছে। বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী যানবাহনের নিবন্ধন, ফিটনেস, কারিগরি নিরাপত্তা এবং প্রযোজ্য অনুমোদন যাচাই করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সড়কে চলাচলের নির্ধারিত শর্ত পূরণে ব্যর্থ যানবাহনের চলাচল আইনানুগভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আইন মেনে বিনিয়োগ করে যাঁরা বৈধ পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী পরিবহন পরিচালনা করছেন, তাঁদের জন্য ন্যায্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নিবন্ধন, ফিটনেস, কর এবং অন্যান্য প্রযোজ্য বিধিবিধান মেনে পরিচালিত পরিবহন ব্যবস্থা যদি অনিয়ন্ত্রিত ও অননুমোদিত যানবাহনের কারণে অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে, তাহলে তা কেবল ব্যবসায়িক স্বার্থের প্রশ্ন থাকে না; এর সঙ্গে আইনের সমান প্রয়োগ, রাজস্ব সুরক্ষা, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং সুশাসনের বিষয়ও যুক্ত হয়। এ কারণে প্রশাসন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), পুলিশ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, পরিবহন মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বয়ে কার্যকর নজরদারি ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি।

পুলিশ, বিআরটিএ, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তথ্য সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করা গেলে দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র নিরূপণ, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ এবং প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ আরও কার্যকর হবে। একই সঙ্গে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কোন প্রতিষ্ঠান কতটা দায়িত্ব পালন করছে, তা মূল্যায়নের জন্য জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দুর্ঘটনার পর বিচার ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আগেই কমিয়ে আনা যায়। প্রতিটি দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ও মোড়ের ত্রুটি সংশোধন, যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দূর করার মধ্য দিয়েই নিরাপদ সড়কের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডি পেরিয়ে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসকে কেবল আলোচনা সভা, ব্যানার, ফেস্টুন কিংবা আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে প্রত্যাশিত পরিবর্তন অর্জন করা সম্ভব হবে না। এই দিবস হওয়া উচিত বিদ্যমান ব্যবস্থার কার্যকারিতা মূল্যায়ন, দুর্বলতা চিহ্নিতকরণ এবং বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের উপলক্ষ। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে সড়ক হবে না মৃত্যুর ফাঁদ; বরং জীবন, জীবিকা ও সম্ভাবনার নিরাপদ পথ। উন্নয়ন হবে, তবে মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে নয়। আইনের প্রয়োগ হবে, তবে ন্যায়সংগত বিবেচনা ও বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে নয়। রাষ্ট্র, প্রশাসন, পরিবহন মালিক-শ্রমিক এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগে এমন একটি সড়ক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে উঠুক, যেখানে মানুষের জীবন সর্বোচ্চ মর্যাদা পাবে, নিরাপত্তার অধিকার সবার জন্য নিশ্চিত হবে এবং উন্নয়নের সুফল পৌঁছাবে সর্বস্তরের মানুষের কাছে।

মামুন অর রশিদ
সাধারণ সম্পাদক
চুয়াডাঙ্গা আন্তঃজেলা ট্রাক ও ট্যাংকলরী শ্রমিক ইউনিয়ন

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।