তারিকুর রহমান, জীবননগর
প্রাচীনকাল থেকে বংশানুক্রমে গড়ে ওঠা গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। আধুনিকতার প্রবল স্রোতে চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় বাংলার প্রাচীন এই শিল্প হারিয়ে যেতে বসেছে। তবে বাঙালির প্রাণের উৎসব নববর্ষকে ঘিরে এখনো উপজেলার বিভিন্ন কুমোরপাড়ায় দেখা মিলছে কর্মব্যস্ততা।
উপজেলার দেহাটি গ্রামের পালপাড়ায় গিয়ে দেখা গেছে, বৈশাখী মেলায় বিক্রির জন্য নানা নকশা ও সুনিপুণ কারুকাজে হাঁড়ি-পাতিল, কলস, কড়াই, দইয়ের পাতিলসহ ছোট-বড় বিভিন্ন মাটির পাত্র তৈরি করছেন কারিগররা। নারী-পুরুষ উভয়েই এ পেশার সঙ্গে যুক্ত।
এক সময় মাটির বাসন-কোসন ছিল গ্রামবাংলার নিত্যব্যবহার্য জিনিস। কিন্তু বর্তমানে মেলামাইন, অ্যালুমিনিয়াম, প্লাস্টিক ও স্টিলের পণ্যের ব্যাপক ব্যবহারে মৃৎশিল্পের কদর কমে গেছে। ফলে অনেক কারিগরই পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছেন।
উপজেলার মনোহরপুর এলাকার কুমোরপাড়ায় প্রায় ১২০ জন মানুষের বসবাস। অধিকাংশই হিন্দু ধর্মাবলম্বী এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এ পেশার সঙ্গে জড়িত। বাড়ির আঙিনাজুড়ে কাদামাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল, কলস ও খেলনা শুকাতে দেখা যায়। অনেক ঘরই এখনো মাটির তৈরি।
রানী পাল ও তার স্বামী তুষার পাল জানান, বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অন্য কাজে যাওয়া তাঁদের পক্ষে সহজ নয়। বিশেষ করে করোনাকালের পর থেকে ব্যবসায় বড় ধরনের মন্দা দেখা দিয়েছে। কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, শ্রমিক মজুরি ও রঙের খরচ বেড়েছে; কিন্তু পণ্যের দাম সে অনুপাতে বাড়েনি।
শিখা পাল বলেন, ভালো মানের এঁটেল মাটি এখন সহজে পাওয়া যায় না। উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাজারে চাহিদা কমে গেছে। তারপরও আমরা পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছি।
স্থানীয়রা জানান, ২০২৫ বছর আগেও মৃৎশিল্পীরা সচ্ছল জীবনযাপন করতেন। কিন্তু প্রযুক্তির উন্নয়ন ও আধুনিক তৈজসপত্রের প্রসারে মাটির তৈরি পণ্যের বাজার সংকুচিত হয়েছে। ফলে নতুন প্রজন্মের অনেকেই অন্য পেশায় ঝুঁকছেন। ইয়ন পাল ও স্বপন পাল অভিযোগ করেন, মৃৎশিল্প টিকিয়ে রাখতে শিল্পের সম্প্রসারণ, আধুনিকায়ন ও বাজারজাতকরণে পর্যাপ্ত সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নেই। যথাযথ সহায়তা পেলে দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশেও মাটির পণ্য রপ্তানি সম্ভব বলে মনে করেন তারা।
এ বিষয়ে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা জাকির উদ্দিন জানান, বংশপরম্পরার এ ঐতিহ্য রক্ষায় সরকারিভাবে কিছু মৃৎশিল্পীকে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এ সহায়তার পরিসর আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
শিল্পবোদ্ধাদের মতে, হাজার বছরের ইতিহাস ও সংস্কৃতির ধারক এই মৃৎশিল্প শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়, বরং নান্দনিকতা ও লোকশিল্পের এক অনন্য প্রকাশ। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে গ্রামবাংলার এই ঐতিহ্য।
জীবননগরের পালপাড়ায় নেই আগের জৌলুস বৈশাখ রাঙাতে মাটির পণ্য তৈরিতে ব্যস্ত কুমোররা



