চলতি বছরে আক্রান্ত ৪১৩ জন ১৭ বছরেও গাংনীতে নিয়ন্ত্রণে আসেনি অ্যানথ্রাক্স সংক্রমণ

তৌহিদ উদ দৌলা রেজা, মেহেরপুর
১৭ বছর যাবৎ অ্যানথ্রাক্স আতংকে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের মানুষ। পশুবাহিত রোগ অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ দেখা দিলেও এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি প্রকোপ। প্রতি বছরই অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন উপজেলার শত শত মানুষ। বিগত ২০১০ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ১৭ বছরে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ২৯৮ জনে। চলতি বছরেই গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৪১৫ জন। প্রাণী সম্পদ বিভাগ থেকে অব্যহত রয়েছে ভ্যাক্সিনেশনের কাজ।
স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত গবাদিপশুর মাংস ও রক্তের সংস্পর্শে এসে মানুষের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু ছড়ায়। অসচেতনতার কারনেই অসুস্থ বা হঠাৎ মারা যাওয়া গরু-ছাগল জবাই করে মাংস নাড়াচাড়া করার সময় মানুষের শরীরে জীবাণু প্রবেশের ঝুঁকি বেশি।
গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নেন ৯৫ জন। ২০১১ সালে ৫১, ২০১২ সালে ৬৭, ২০১৩ সালে ১৯৯, ২০১৪ সালে ২০৩, ২০১৫ সালে ১৫৪, ২০১৬ সালে ২৪০, ২০১৭ সালে ২৮১, ২০১৮ সালে ৪০৮, ২০১৯ সালে ৬৬০, ২০২০ সালে ৩৭৮, ২০২১ সালে ৪১৭, ২০২২ সালে ৬৪৪, ২০২৩ সালে ৭৯২, ২০২৪ সালে ৬৮৬ এবং ২০২৫ সালে ৬০৭ জন অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ৭৯২ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছিলেন। চলতি বছরও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বছরের ৯ মাসে ৪১৩ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। চলতি মাসেই ৩০ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।
অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত মানুষের শরীরে সাধারণত হাত-পায়ে ক্ষত বা ঘায়ের সৃষ্টি হয়। শুরুতে অনেক সময় ছোট ফোসকা বা পক্সের মতো দেখা দিলেও পরে আক্রান্ত স্থানে ক্ষত তৈরি হয়। অনেকেই স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নেন তবে পরবর্তীতে রোগটি সারলে অনেকই হাসপাতালে আসেন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সাধারণত কয়েক সপ্তাহ চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে ওঠেন তারা।
গাংনী পৌর শহরের ঝিনেরপুল এলাকার শাহনাজ খাতুন কয়েকদিন আগে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হন। তিনি বলেন, হঠাৎ একটি খাসি ছাগল সবার অজান্তেই রাতের আধাঁরে মরে পড়ে ছিলো। আরও একটি ছাগল অসুস্থ হয়ে পড়লে সেটি জবাই করে মাংস নাড়াচাড়া ও সেই মাংস খেয়েছেন। কয়েকদিন পর তিনি শরীরে পক্সের মতো ছোট ক্ষত দেখতে পান। পরে হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারেন তিনি অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়েছেন। চিকিৎসা নিয়ে তিনি অনেকটাই সুস্থ আছেন। তবে ছাগল পালন করেই সংসারের টুকিটাকি খরচ চালান তিনি। এভাবে হঠাৎ গরু ছাগল মারা গেলে দরিদ্র পরিবারগুলো বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে।
চৌগাছা গ্রামের নুরুল ইসলাম জানান, বেশ কিছুদিন আগে দুটি ছাগল মারা গেছে। তার কয়েকদিন পরে আবারও একটি ছাগল অসুস্থ হলে সেটি তিনি জবাই করে মাংসের কাজ করেছেন। তিনদিন পর দুই হাতের দুটি আঙ্গুলে হঠাৎ ঘা ও প্রচ- ব্যথা শুরু হয়। হাসপাতালে গেলে চিকিৎসকেরা তাঁকে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি জানান। বর্তমানে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত মানুষের তথ্য স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সংরক্ষণ করা হলেও প্রতি বছর ঠিক কতটি গরু-ছাগল এই রোগে মারা যাচ্ছে, তার পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান নেই উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের কাছে। তবে বিপুলসংখ্যক গবাদিপশু এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা জানিয়েছে ইতোপূর্বে মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলার সীমান্তবর্তী তিনটি ইউনিয়ন কাজিপুর, তেতুলবাড়িয়া ও মটমুড়া ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হলেও বর্তমানে তা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে এ রোগ ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের পর থেকে সরকারি একটি প্রকল্পের আওতায় অ্যানথ্রাক্সে ক্ষতিগ্রস্ত কিছু খামারিকে আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়েছে।
প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলছে, অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় সব গবাদিপশুকে সময়মতো টিকা দেওয়া এবং নিয়মিত নজরদারি করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
গাংনী উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয়ে মোট ১১টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র চারজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ, একজন ভেটেরিনারি সার্জন, চারটি উপসহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (সম্প্রসারণ), একজন উপসহকারী প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা (কৃত্রিম প্রজনন) এবং অফিস সহায়কের একটি পদ শূন্য রয়েছে।
গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. ইসতিয়াক আহমেদ মাসুদ বলেন, অসুস্থ গরু, ছাগল, মহিশ ও ভেড়া থেকে অ্যানথ্রাক্সে ছড়িয়ে পড়ছে। প্রায়ই অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত রোগী আসছে হাসপাতালে। চিকিৎসকের পরার্মশ অনুযায়ী অনেক রোগী নিজ নিজ বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। সরকারী ভাবে সকল ওষুধ সরবারহ করা হচ্ছে। আমাদের তো প্রতিরোধের উপায় নেই আমরা শুধু চিকিৎসা দিয়ে থাকি। এবং মানুষকে আমরা অসুস্থ গরু ছাগল জবাই না করার পরামর্শ দিচ্ছি।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. তোফাজ্জেল হোসেন বলেন, গবাদি পশুকে শুধু মাত্র ভ্যাক্সিন দেওয়ার মাধ্যমে অ্যানথ্রাক্স পুরোপুরি দমন করা সম্ভব নয়। গবাদি পশুর মালিক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে শতভাগ গবাদিপশুকে অ্যানথ্রাক্সের টিকা দেওয়ার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে জনবল সংকটের কারণে আমরা সময় মত ভ্যাক্সিনেশনের কাজ শেষ করতে পারছিনা। তবে আমাদের বিভিন্ন প্রকল্পে জনবল নিয়ে কিন্তু আমরা আমাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।