আলমডাঙ্গায় জব্দ ৪৪০ বস্তা টিএসপি সার সরকারি দামে কৃষকদের কাছে বিক্রি

আলমডাঙ্গা অফিস


আলমডাঙ্গায় পাচারের অভিযোগে জব্দ করা ৪৪০ বস্তা মরক্কোর টিএসপি সার সরকারি নির্ধারিত মূল্যে কৃষকদের মধ্যে বিক্রি শুরু হয়েছে। গতকাল সোমবার বিকেল ৩টার দিকে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে এ কার্যক্রম শুরু হয়।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, আলমডাঙ্গার ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা থেকে নির্বাচিত কৃষকদের মধ্যে জব্দ করা সার বিতরণ করা হচ্ছে। সরকারি নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী প্রতি বস্তা টিএসপি সারের দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা। কৃষকরা সার কার্ড প্রদর্শন করে সর্বোচ্চ এক বস্তা সার কিনতে পারছেন। বিক্রির অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হবে।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ৪৪০ বস্তা সার বস্তাপ্রতি ১ হাজার ৩৫০ টাকা দরে বিক্রি হলে মোট ৫ লাখ ৯৪ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হবে।
আলমডাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ হোসেন পলাশ বলেন, যশোরের নওয়াপাড়া থেকে আলমডাঙ্গায় আসার পথে ৪৪০ বস্তা মরক্কোর টিএসপি সারসহ একটি ট্রাক আটক করা হয়। পরে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা করে সারগুলো জব্দ করা হয়। এখন জব্দ করা সার সরকারি নির্ধারিত মূল্যে কৃষকদের মধ্যে বিক্রি করা হচ্ছে। তিনি জানান, উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা থেকে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কৃষকদের নির্বাচন করা হয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে ২৭ জন করে কৃষক সার নিচ্ছেন। সার নিতে কৃষকের সার কার্ড থাকা বাধ্যতামূলক এবং একজন কৃষক সর্বোচ্চ এক বস্তা সার কিনতে পারবেন।
কৃষি কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে শাকসবজি, কলা, পেঁপেসহ বিভিন্ন ফসলে টিএসপি সারের চাহিদা রয়েছে। কৃষকদের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে জব্দ করা সার দ্রুত তাদের মধ্যে বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জানা গেছ, এর আগে রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সকালে চুয়াডাঙ্গা-হাটবোয়ালিয়া সড়কের চিৎলা বাজার এলাকায় ৪৪০ বস্তা টিএসপি সারসহ একটি ট্রাক আটক করা হয়। স্থানীয়রা ট্রাকটি আটক করার পর হাপানিয়া ক্যাম্প পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সার ও চালককে হেফাজতে নেয়। পরে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গিয়ে ট্রাকটি আলমডাঙ্গা থানার হেফাজতে নেন।
আটক ট্রাকটির নম্বর ঝিনাইদহ-ট-১১-১১৪৫। ট্রাকের সঙ্গে থাকা চালানে টিএসপি সার ও পরিবহনের পরিমাণসহ বিভিন্ন তথ্য হাতে লেখা ছিল। চালানের তথ্য, আটক সার, গন্তব্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দেয়।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, আটক সারগুলো ভাংবাড়িয়া ইউনিয়নের মুদি ব্যবসায়ী মিনারুল ইসলামের বলে জানা গেছে। তবে মিনারুল ইসলাম দাবি করেন, ইউনিয়নের কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী যশোরের নওয়াপাড়া থেকে এসব সার আনা হচ্ছিল। পরে রোববার বিকেলে ট্রাকের চালক ও মিনারুল ইসলামকে আলমডাঙ্গা থানায় নেওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদের উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে নেওয়া হয়। সন্ধ্যার পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহিনুর আক্তারের উপস্থিতিতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। এ সময় মিনারুল ইসলামকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং ৪৪০ বস্তা সার জব্দ করা হয়। ট্রাক ও চালককেও হেফাজতে রাখা হয়।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, এর আগেও ভাংবাড়িয়া ইউনিয়নের মিনারুল স্টোর থেকে বিপুল পরিমাণ সার উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ হোসেন পলাশও জানিয়েছেন, ওই ব্যবসায়ীকে অতীতে একাধিকবার মুচলেকা ও জরিমানা দিতে হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, অনুমোদিত সরকারি ডিলার পয়েন্টে থাকার কথা যে পরিমাণ সার, তার তুলনায় ওই ব্যবসায়ীর গোডাউনে বেশি পরিমাণ সার মজুত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এসব সার শুধু ভাংবাড়িয়া ইউনিয়ন নয়, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা এমনকি জেলার বাইরেও সরবরাহ করা হয় বলেও অভিযোগ তাদের।
কৃষকদের দাবি, শুধু জরিমানা করে বিষয়টি শেষ না করে সরকারি সার পরিবহন, বরাদ্দ ও ডিলার পর্যায়ে সরবরাহের পুরো প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সরকারি সরবরাহব্যবস্থার বাইরে এত বিপুল পরিমাণ সার কীভাবে গেল এবং এর সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা সিন্ডিকেট জড়িত কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ হোসেন পলাশ বলেন, বস্তায় থাকা লট নম্বর, চালান নম্বরসহ বিভিন্ন তথ্যের ছবি সংগ্রহ করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিএডিসির সঙ্গে কথা হয়েছে। এসব তথ্য তাদের কাছে পাঠানো হবে। কোন লট থেকে সারগুলো আলমডাঙ্গায় এসেছে, তা তদন্ত করে দেখতে বলা হয়েছে। তিনি আরও জানান, আলমডাঙ্গার প্রতিটি ডিলার পয়েন্টে টিএসপি সারের বরাদ্দ রয়েছে। পরবর্তী মাসেও ফসলের চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হবে।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, সরকারি সার পরিবহন, বরাদ্দ ও ডিলার পর্যায়ে সরবরাহের কোনো পর্যায়ে অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে কৃষি বিভাগের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসূত্র পাওয়া গেলে তাকেও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানান তারা।
জব্দ করা ৪৪০ বস্তা টিএসপি সার সরকারি দামে কৃষকদের মধ্যে বিক্রি শুরু হওয়ায় স্থানীয়ভাবে সারের সংকট কিছুটা কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে সরকারি সরবরাহব্যবস্থার বাইরে এত বিপুল পরিমাণ সার কীভাবে গেল, তা নিয়ে তদন্তের দাবি রয়ে গেছে।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।