খন্দকার শাহ আলম মন্টু, আলমডাঙ্গা
কবি, সাংবাদিক, স্থানীয় ইতিহাস অন্বেষক ও সম্পাদক কহন কুদ্দুস ১৯৭৬ সালের ৬ জুন আলমডাঙ্গা উপজেলার কালিদাসপুর ইউনিয়নের কুমার নদের তীরঘেঁষা চরশ্রীরামপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতৃপ্রদত্ত নাম মোহাম্মদ আব্দুল কুদ্দুস। তবে লেখক, পাঠক ও সুধীসমাজে তিনি ‘কবি কহন কুদ্দুস’ নামেই অধিক পরিচিত।
তাঁর পিতা আজিবর মুন্সী এবং মাতা মৃত কহিনুর বেগম। আট ভাই-বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। বড় পরিবারে বেড়ে ওঠার কারণে শৈশবের একটি সময় তিনি খালার বাড়িতে কাটান। খালুর চাকরিসূত্রে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা হয় ময়মনসিংহের মোমেনশাহি সেনানিবাস হাউজিং এস্টেট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরে তিনি আলমডাঙ্গা সিদ্দিকীয়া আলিম মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন।
১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৪৬ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে খণ্ডকালীন চাকরিতে যোগ দেন কহন কুদ্দুস। তবে স্বাধীনচেতা মন ও মুক্তচিন্তার কারণে গণ্ডিবদ্ধ জীবন থেকে বেরিয়ে এসে পরবর্তীতে ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেন।
সাহিত্যের প্রতি অনুরাগের পাশাপাশি ২০০৮ সালে দৈনিক ‘বাংলার দূত’ পত্রিকার মাধ্যমে তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা। পরে তিনি দৈনিক ‘খাসখবর’-এর ব্যুরো প্রধান এবং দৈনিক ‘বাংলাদেশ বার্তা’র স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
কৈশোর থেকেই সাহিত্যের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ। বাংলার প্রকৃতি, প্রেম-বিরহ, সামাজিক অবক্ষয় ও শোষণের চিত্র তাঁর লেখায় যেমন উঠে এসেছে, তেমনি বাস্তব, পরাবাস্তব ও জাদুবাস্তবতার মিশেলে তিনি নির্মাণ করেছেন নিজস্ব কাব্যভাষা। তাঁর লেখায় একদিকে যেমন মাটির গন্ধ ও মানুষের জীবন উঠে আসে, অন্যদিকে তেমনি প্রতিফলিত হয় সময়, সমাজ ও অস্তিত্বের নানা জিজ্ঞাসা।
তাঁর প্রকাশিত একক সাহিত্যকর্মের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ‘তুমি আসবে বলে’ (২০০৫) ও ‘কালের সাম্পান’ (২০১৪), প্রবন্ধ সংকলন ‘সময়ের সংলাপ’ (২০০৬) এবং গল্পগ্রন্থ ‘শরতে গোধূলি বেলায়’ (২০০৭)। এ ছাড়া তাঁর ৩০টিরও বেশি যৌথ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়ও গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর লেখা।
তাঁর সম্পাদিত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা ও সংকলনগ্রন্থ ‘ডাঙা’। আলমডাঙ্গা ও আশপাশের অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং স্থানীয় কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকদের জীবন ও সৃজনশীল কর্মকে এক মলাটে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে গ্রন্থটি বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। স্থানীয় ইতিহাস ও সাহিত্য-সংস্কৃতির তথ্য সংরক্ষণে ‘ডাঙা’ তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস হিসেবে বিবেচিত। কহন কুদ্দুস ‘উদ্ভাস সাহিত্য সংস্থা’র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। তিনি পৌর পাঠাগারের আজীবন সদস্য এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত।
আলমডাঙ্গা হাইরোডে উদ্ভাস সাহিত্য সংস্থার কার্যালয়টি দীর্ঘদিন ধরে লেখক, গবেষক, শিক্ষক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক আড্ডার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। নিয়মিত আড্ডা, আলোচনা ও সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে স্থানটি স্থানীয় সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে একটি প্রাণবন্ত পরিসর তৈরি করেছে।
সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কহন কুদ্দুস পেয়েছেন আলমডাঙ্গা ২১শে বইমেলা সনদ (২০০৫), বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক পরিষদ সম্মাননা (২০০৭) এবং মৃত্তিকা পদক (২০০৮)।ব্যক্তিজীবনেও তিনি সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিবারকে যুক্ত রেখেছেন। তাঁর স্ত্রী আলেয়া আক্তার বিউটি আলমডাঙ্গা সরকারি কলেজে কর্মরত। তাঁদের দুই পুত্র। বড় ছেলে আশিকুর রহমান আসিফ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আব্দুর রউফ হল সংসদের স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি তিনি একজন ক্রীড়াবিদ এবং দূরপাল্লার দৌড় প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশ নেন। ছোট ছেলে আশরফি রহমান আরিক আলমডাঙ্গা একাডেমিতে নার্সারিতে অধ্যয়নরত।
বর্তমানে কহন কুদ্দুস স্ত্রী ও ছোট ছেলেকে নিয়ে আলমডাঙ্গার কালিদাসপুর দক্ষিণপাড়ায় নিজ বাড়িতে বসবাস করছেন। সাহিত্যচর্চা, সাংবাদিকতা, স্থানীয় ইতিহাস অনুসন্ধান এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের শেকড় ও সময়কে ধারণ করে চলেছেন। তাঁর নিরন্তর অন্বেষণের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ, মাটি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য—যা তাঁর সাহিত্যকর্ম ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়।
শব্দ, শেকড় ও ইতিহাসের সন্ধানে কবি কহন কুদ্দুস



