নাজমুল হক শাওন, আলমডাঙ্গা
আলমডাঙ্গা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল নিবন্ধন কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে অফিসের বড়বাবু আব্দুল হান্নানের বিরুদ্ধে। সেবাগ্রহীতাদের দাবি, সরকারি নির্ধারিত ফি পরিশোধের পরও দলিল দ্রুত এজলাসে উপস্থাপনসহ বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করতে হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র ও একাধিক সেবাগ্রহীতার অভিযোগ অনুযায়ী, জমি ক্রয়-বিক্রয়, হেবা, দানপত্র ও বণ্টনসহ বিভিন্ন ধরনের দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সরকারি প্রক্রিয়া সম্পন্ন থাকলেও অনেক সময় ফাইল আটকে রাখা হয়। পরে অনানুষ্ঠানিকভাবে অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের মাধ্যমে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সেবাগ্রহীতা জানান, অতিরিক্ত অর্থ সরাসরি নয়; বরং দলিল লেখকদের মাধ্যমে বড়বাবুর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে এ ধরনের অর্থ লেনদেন হয়ে আসছে।
সম্প্রতি সাংবাদিক পরিচয় গোপন করে সাধারণ সেবাগ্রহীতার ছদ্মবেশে আলমডাঙ্গা উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যান। সেখানে জমি রেজিস্ট্রির বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে অফিসের অভ্যন্তরীণ খরচ সম্পর্কে জানতে চাইলে বড়বাবু আব্দুল হান্নান বলেন, দলিল এজলাসে তুলতে হলে ২ হাজার ৫০০ টাকা দিতে হবে এবং সেই অর্থ তার কাছেই জমা দিতে হবে। সাংবাদিকরা ওই অর্থের সরকারি ভাউচার সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, টাকা দেবেন, কাজ হবে, ভাউচার পেয়ে লাভ কী? পরে তিনি এটিকে দলিল ফি হিসেবে উল্লেখ করেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সরকারি বিধি অনুযায়ী দলিলপ্রতি নির্ধারিত একটি নির্দিষ্ট ফি রয়েছে। এ অবস্থায় অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সাব-রেজিস্ট্রি অফিস সূত্রে জানা যায়, সপ্তাহে দুই দিন দলিল নিবন্ধনের কার্যক্রমে দুই থেকে তিন শতাধিক দলিল সম্পন্ন হয়। সে হিসেবে মাসে গড়ে ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০টি দলিল নিবন্ধিত হয়ে থাকে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিটি দলিল থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হলে মাসিক অবৈধ লেনদেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হতে পারে।
সেবাগ্রহীতা নান্নু আহমেদ অভিযোগ করেন, ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের একটি দলিল নিবন্ধনের জন্য তার কাছ থেকে মোট ১ লাখ ১০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। পরবর্তীতে সাংবাদিকদের অনুসন্ধান শুরু হলে তার বাড়িতে গিয়ে অতিরিক্ত আদায় করা অর্থের একটি অংশ ফেরত দিয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করার পর বিভিন্নভাবে মীমাংসার চেষ্টা এবং বিভিন্ন মহল থেকে হুমকি-ধমকির অভিযোগও পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একটি সূত্রের দাবি, আব্দুল হান্নান সরকারি চাকরিতে যোগদানের আগে নকল নবীশ হিসেবে কাজ করতেন এবং বর্তমানে আলমডাঙ্গা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের বড়বাবুর দায়িত্ব পালন করছেন। একই সূত্রের ভাষ্য, গত ছয় মাসে তিনি চুয়াডাঙ্গা সদরে প্লটসহ দুটি বাড়ি ক্রয় করেছেন। তবে এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো প্রামাণ্য নথি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নিবন্ধিত দলিল লেখক অভিযোগ করেন, অফিসে সমিতির কার্যক্রম না থাকলেও সমিতির নাম ব্যবহার করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন এলাকার দালালরা নিজেদের দলিল লেখক পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে পরে নিবন্ধিত দলিল লেখকদের নাম ব্যবহার করে দলিল নিবন্ধন সম্পন্ন করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দলিল লেখকদের পারিশ্রমিকের একটি প্রচলিত হার রয়েছে। তবে বড়বাবুর ছত্রছায়ায় থাকা কিছু দালাল অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত বড়বাবু আব্দুল হান্নানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়, নিবন্ধন অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করে সেবাগ্রহীতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণেরও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।



