চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে আউটডোরে ডাক্তারদের চেম্বার বেশিরভাগ সময় তালাবন্ধ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের রেফার করা রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছেন উপ-সহকারি মেডিকেল অফিসার!

স্টাফ রিপোর্টার : মুন্না রহমান


মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকারের মধ্যে চিকিৎসা সেবা অন্যতম। কিন্তু চুয়াডাঙ্গা জেলার জনমানুষের যেন এই একটি মৌলিক অধিকারের ব্যাপক ঘাটতি রয়েই গেছে। জেলার চার উপজেলার প্রায় ১৩ লাখ মানুষের চিকিৎসার প্রধান কেন্দ্র চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল। ১০০ শয্যার এই হাসপাতালটি বহুদিন থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার দাবী থাকলেও তার কোনো প্রতিফলন নেই। উল্টো চিকিৎসক আর জনবল সংকটে হাসপাতালটিতে চিকিৎসা সেবা পাওয়া দুরুহ ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। আউটডোরে চিকিৎসকদের চেম্বার বেশিরভাগ সময় তালাবন্ধ থাকে। অসহায় গরীব মানুষেরা ডাক্তার দেখানোর জন্য আউট ডোরের টিকিট কেটে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থেকে অধোর্য্য হয়ে চিকিৎসা না পেয়ে বাড়ি ফেরেন। প্রতিদিন শত শত রোগী এসে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও চিকিৎসক না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন অথবা বাধ্য হচ্ছেন বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২৫০ শয্যার জনবল কাঠামো অনুযায়ী যেখানে পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকার কথা, সেখানে বেশির ভাগ পদই শূন্য। বিশেষ করে কনসালটেন্ট ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে জটিল অস্ত্রোপচার এবং উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রায় বন্ধের পথে। হৃদরোগ (কার্ডিওলজি), চক্ষু,  মেডিসিন,  ডেন্টাল এবং চর্ম রোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে চিকিৎসক নেই। এর ফলে এ সমস্ত রোগে আক্রান্ত রোগীদের জেলা শহরের বাইরে রেফার করতে হচ্ছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে রেফার করা রোগীদের সদর হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে ইন্টার্ন বা উপ-সহকারি মেডিকেল অফিসার। এ রকম ভয়াবহ অবস্থা চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে বিরাজ করছে।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের প্রধান সহকারী আব্দুস সবুরের তথ্য মতে, বর্তমানে সদর হাসপাতালে সিনিয়র কনসাল্টেন্ট (গাইনী) ১ জন, সিনিয়র কনসালটেন্ট (অর্থো সার্জারি) ১ জন, জুনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারি) ১ জন, জুনিয়র কনসালটেন্ট (অ্যানেসথেসিয়া) ১ জন, জুনিয়র কনসালটেন্ট ( অর্থো ও ট্রমাটিক) ১ জন, রেডিওলজিস্ট ১ জন, প্যাথলজিস্ট ১ জন, মেডিকেল অফিসার (এম.ও) ৪ জন, এম.ও (আয়ুর্বেদ) ১ জন ও এম.ও (হোমিও) ১ জন। এই মোট ১৩ জন চিকিৎসক দিয়ে চলছে জেলার চিকিৎসা কার্যক্রম। তবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে আরো ১৭ জনসহ মোট ৩০ চিকিৎসক দিয়ে হাসপাতালের বহিবিভাগ পরিচালনা করা হচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের পুরাতন ভবনের ১০১ নং কক্ষে আবাসিক মেডিকেল অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) ডাঃ মোঃ নাজমুস সাকিব, ১০৯ নং কক্ষে জুনিয়র কনসালটেন্ট (শিশু) ডাঃ মোঃ আসাদুর রহমান মালিক, ১২১ নং কক্ষে সিনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনী) ডাঃ আকলিমা খাতুন, জুনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনী) ডাঃ হোসনে জারি তাহমিনা ও জুনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনী) ডাঃ সোনিয়া আহমেদ, ১২৩ নং কক্ষে মেডিকেল অফিসার ডাঃ শাপলা খাতুন, ২০১ নং কক্ষে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ বিদ্যুৎ কুমার বিশ্বাস, ২০২ নং কক্ষে সিনিয়র কনসাল্টেন্ট (অর্থোসার্জারি) ডাঃ মোঃ আব্দুর রহমান, ২০৫ নং কক্ষে জুনিয়র কনসালটেন্ট (অর্থো) ডাঃ মোঃ মিলনুরজ্জামান জোয়ার্দার, ২০৭ নং কক্ষে জুনিয়র কনসালটেন্ট (চর্ম) ডাঃ লাইলা শামীমা শারমিন, ২০৮ নং কক্ষে মেডিকেল অফিসার (হোমিও) ডাঃ মোঃ হারুন উর রশীদ, ২০৯ নং কক্ষে জুনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারি) ডাঃ মোঃ এহসানুল হক তন্ময় ও ২১৫ নং কক্ষে জুনিয়র কনসালটেন্ট (অর্থো) ডাঃ মোঃ রোকনুজ্জামান চিকিৎসা সেবা প্রদান করছেন।
সেই সাথে নতুন ভবনের ২০০১ নং কক্ষে মেডিকেল অফিসার ডাঃ মোঃ ওয়াহিদ মাহমুদ রবিন, ২০০২ নং কক্ষে মেডিকেল অফিসার ডাঃ মোঃ আব্দুল কাদের, ২০০৩ নং কক্ষে মেডিকেল অফিসার ডাঃ মোঃ আল ইমরান জুয়েল, ২০০৫ নং কক্ষে মেডিকেল অফিসার ডাঃ মোঃ জাফর ইকবাল, ২০০৬ নং কক্ষে জুনিয়র কনসালটেন্ট (কার্ডিওলোজি) ডাঃ মোঃ নুরে আলম আশরাফি, ২০১১ নং কক্ষে মেডিকেল অফিসার ডাঃ মোঃ দেলোয়ার হোসেন, ২০১৩ নং কক্ষে জুনিয়র কনসালটেন্ট (শিশু) ডাঃ মোঃ মাহবুবুর রহমান মিলন, ২০১৪ নং কক্ষে রেডিওলজিস্ট ডাঃ মোঃ নাসিমুজ্জামান, ২০১৫ নং কক্ষে মেডিকেল অফিসার (আয়ুর্বেদিক) ডাঃ মোঃ হুমায়ুন কবির, ৩০০১ নং কক্ষে মেডিকেল অফিসার ডাঃ ইসরাত জেরিন, ৩০০২ নং কক্ষে মেডিকেল অফিসার ডাঃ মোঃ তারেক জুনায়েত, ৩০০৪ নং কক্ষে মেডিকেল অফিসার ডাঃ হাওয়াতুননেছা, ৩০০৫ নং কক্ষে মেডিকেল অফিসার ডাঃ মার্বিন অনিক চৌধুরী, ২০০৪ নং কক্ষে মেডিকেল অফিসার ডাঃ আফরিনা ইসলাম ও ডাঃ মোর্শেদা জাহান, ৩০১০ নং কক্ষে প্যাথলজিস্ট ডাঃ শিরিন জেবিন সুমি এবং অপারেশন থিয়েটারে জুনিয়র কনসালটেন্ট (এনেস্থিসিয়া) ডাঃ এমএম রাইসুল ইসলাম চিকিৎসা সেবা প্রদান করছেন। তবে বরাবরের মত এ সব কক্ষে ডাক্তার পাওয়া খুবই দুরুহ ব্যাপার বলে জানালেন অনেক রোগী ও তার স্বজনরা।
এদিকে সকাল থেকেই হাসপাতালের বহির্বিভাগে দেখা যায় মানুষের উপচে পড়া ভিড়। টিকিট কেটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক সময় দেখা মেলে না চিকিৎসকের। ডাক্তার কখন আসবেন এর কোন সদুত্তর কেউ রোগীদের দেননা। অনেকে সান্তনা দেওয়ার জন্য বলেন, চিকিৎসক অন্তর্বিভাগে রাউন্ডে গেছে অথবা জরুরিভাবে কর্মরত আছেন। এভাবে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকে জনগণের ভোগান্তি যেন পৌঁছেছে চরমে।
গত শনিবার পাঁচ বছরের ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা তাসকিয়া খাতুন বলেন, সকাল ৮ টায় লাইনে দাঁড়িয়েছি। দুপুর হয়ে গেল, ডাক্তার দেখাতে পারলাম না। শুনছি ডাক্তার নাকি রাউন্ডে আছেন। সকাল থেকে না খেয়েই ডাক্তার দেখানোর উদ্দেশ্যে হাসপাতালে বসে আছি অথচ ডাক্তার দেখানোর কোন সুযোগ হচ্ছে না।
হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের অবস্থাও শোচনীয়। চিকিৎসক সংকটের কারণে রাউন্ডে চিকিৎসকদের দেখা পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। সেবিকাদের (নার্স) ওপর ভরসা করেই কাটাতে হয় দিনের পর দিন। কোনো জরুরি অবস্থা সৃষ্টি হলে অন-কল ডাক্তার পেতেও বেগ পেতে হয়। হাসপাতালের এই সংকটের সুযোগ নিচ্ছে একদল স্বার্থান্বেষী মহল। হাসপাতালে চিকিৎসক নেই, এই অজুহাত দিয়ে দালালচক্র রোগীদের কৌশলে বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে নামমাত্র খরচে সরকারি সেবা পাওয়ার আশায় এসে সাধারণ মানুষকে গুনতে হচ্ছে মোটা অংকের টাকা।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. নাজমুস সাকিব বলেন, চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালটি ১০০ শয্যা বিশিষ্ট হলেও জনবল আছে ৫০ শয্যার। মাত্র ১৩ জন চিকিৎসক হাসপাতালে কর্মরত আছেন। বাকি চিকিৎসক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে নিয়ে আসতে হয়েছে। এদিকে সেবিকা বা নার্স রয়েছে ৬৮ জন। হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় গড়ে ৮০০ থেকে ৯০০ রোগী চিকিৎসা নিয়ে থাকে। এই সামান্য জনবল দিয়ে এত সংখ্যক রোগীকে চিকিৎসা সেবা দিতে আমরা হিমশিম খাচ্ছি। হাসপাতালটি ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হলে জেলাবাসীর চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত হবে।
চুয়াডাঙ্গার সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষের দাবি জনস্বার্থে অতি দ্রুত এই হাসপাতালটি ২৫০ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত করা হোক। অন্যথায় এই বিশাল অঞ্চলের চিকিৎসা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের বর্তমান চিত্র সেই অধিকারের ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও যদি তা চালানোর মতো বিশেষজ্ঞ না থাকেন, তবে সেই দালান কেবল এক শ্বেতহস্তী ছাড়া আর কিছুই নয়। সরকার দ্রুত এই সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন এমনটাই প্রত্যাশা জেলার ১৩ লাখ মানুষের।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।