কালের বিবর্তনে সেই অমৃতসাগর কলা প্রায় হারিয়ে গেলেও বন্ধ হয়নি বদরগঞ্জ কলার হাট হাটে সপ্তাহে বেচা-কেনা হয় ৫ লাখ টাকার

সরোজগঞ্জ প্রতিনিধি
চুয়াডাঙ্গার ঐতিহ্যবাহী বদরগঞ্জ কলার হাট দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ পরিচিত। এক সময় চুয়াডাঙ্গা জেলায় উৎপাদিত অমৃতসাগর, সবরি ও চিনি চাঁপা কলার সুনাম ছিল দেশজুড়ে। কালের বিবর্তনে সেই অমৃতসাগর কলা প্রায় হারিয়ে গেলেও বন্ধ হয়নি বদরগঞ্জ কলার হাট। বর্তমানে এ হাটে বিভিন্ন জাতের কলা বিক্রি হচ্ছে। চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের অন্যতম পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী বাজার বদরগঞ্জ কলার হাট। প্রায় ৩০ বছর আগে শুরু হওয়া এ হাট বসে প্রতি বৃহস্পতিবার ও রবিবার। প্রতি হাটে প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকার কাঁচা কলা কেনাবেচা হয়।
এ অঞ্চলের কলার সুনাম, খাজনা নিয়ে তেমন জটিলতা না থাকা এবং সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে দূর-দূরান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে এসে কলা কিনে নিয়ে যান। যদিও আগের তুলনায় হাটটির জৌলুস কিছুটা কমেছে, তবুও স্থানীয়রা ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভোর থেকেই জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষকরা ভ্যানযোগে গাভানল, সাগর, চিনি চাঁপা ও সবরি জাতের কলা নিয়ে হাটে আসছেন। হাটে কলার কাঁদি সারি সারি করে সাজিয়ে রাখা হয়। পরে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে দর-কষাকষির মাধ্যমে কেনাবেচা সম্পন্ন হয়। জাত ও আকারভেদে প্রতি কাঁদি কলা ৩০০ থেকে ১২০০ টাকায় বিক্রি হয়। প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টার এই হাটে মোট ৪ থেকে ৫ লাখ টাকার কলা বিক্রি হয়।
বদরগঞ্জ কলার হাটে আসা ব্যবসায়ীরা জানান, তারা দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর ধরে কাঁচা কলার ব্যবসা করছেন। জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের কাছ থেকে কলা কিনে এনে এই হাটে বিক্রি করেন। ফলে সকাল থেকেই হাটে হাজার হাজার ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগম ঘটে।
সরোজগঞ্জের দত্তাইল গ্রামের কলা ব্যবসায়ী হযরত আলী বলেন, চুয়াডাঙ্গা উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে কৃষকদের ক্ষেত থেকে কলা কিনে এখানে এনে বিক্রি করি। প্রায় ৩০ বছর ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত আছি। সারা বছরই বদরগঞ্জে কলা পাওয়া যায় এবং এই ব্যবসা করে আমরা লাভবান হয়েছি।
হাটে আসা মাহাম্মুজমা গ্রামের রনি ও বাগুন্দা গ্রামের শহিদ জানান, তারা প্রতি সপ্তাহে এখান থেকে কলা কিনে ঢাকায় নিয়ে যান এবং স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন। এতে মোটামুটি লাভ হয়।
এদিকে কুতুবপুর ইউনিয়নের কলাচাষিরা জানান, ঝড়-বাতাসে প্রায়ই কলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি কলাগাছ থেকে ফল পেতে প্রায় এক বছর সময় লাগে। এছাড়া বিভিন্ন রোগবালাইয়ের কারণেও অনেক সময় ফলন কমে যায় এবং কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া যায় না।
ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুণ্ডু উপজেলার হিঙ্গেরপাড়া গ্রামের মোহাম্মদ আলী জানান, ১৯৯০ সালের দিকে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা খরচ করে তিনি বদরগঞ্জ কলার হাটটি শুরু করেছিলেন। ঢাকার ব্যবসায়ীদের এনে এখান থেকে কলা কিনে ট্রাকে লোড করে পাঠানোর ব্যবস্থাও করেছিলেন। তবে বর্তমানে হাটটি আগের মতো জমজমাট নেই বলে তিনি আক্ষেপ করেন।
বাজার কমিটির সভাপতি মো. আবুল কালাম আজাদ মিন্টু বলেন, বদরগঞ্জ কলার হাট তার আগের ঐতিহ্য হারালেও সেটি পুনরুদ্ধারে আমরা উদ্যোগ নিয়েছি। হাট সম্প্রসারণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য কাজ করা হচ্ছে।
বদরগঞ্জ মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. ফারুন হোসেন জানান, কলার হাটে ট্রাকের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব তাদের ইউনিয়ন পালন করে আসছে। হাট থেকে পাওয়া অর্থের একটি বড় অংশ এলাকার শিক্ষা, সামাজিক কার্যক্রম ও অসহায় মানুষের সহায়তায় ব্যয় করা হয়েছে। তবে বর্তমানে হাটে আগের মতো কলা না আসায় ট্রাক ভাড়া ও অন্যান্য খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।