চুয়াডাঙ্গায় শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণ

স্টাফ রিপোর্টার :


মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-২০২৬ উদযাপন উপলক্ষে চুয়াডাঙ্গায় আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় শহরের ডিসি সাহিত্য মঞ্চে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুন্সি আবু সাইফ ও চুয়াডাঙ্গা পৌর ডিগ্রী কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক আয়েশা আক্তার রিক্তার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে আলোচনা সভায় বক্তারা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য, মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে ভাষা আন্দোলনের চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বক্তারা বলেন, মাতৃভাষার জন্য বাঙালি জাতি যে আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। একুশের চেতনা ধারণ করে বাংলা ভাষার শুদ্ধ চর্চা ও ব্যবহারে সকলকে সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে মাতৃভাষা সংরক্ষণে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তারা।

এসময় পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, আজকের দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ আমাদের এই জাতির জন্য। যে সূচনা হয়েছিল ১৯৪৭ সাল থেকে। সেই ভাষার বৈষম্য থেকে আমাদের ৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং ২৪ এর গণঅভ্যুত্থান। ​আমি আমার বক্তব্যের শুরুতে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি যারা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছেন। সেই সাথে স্মরণ করছি ১৯৭১ সালে যারা শহীদত্ব বরণ করেছেন তাদেরকে, যাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা একটা স্বাধীন রাষ্ট্র পেয়েছি। স্মরণ করছি বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরকে। সেই সাথে স্মরণ করছি জুলাই বিপ্লবে যারা শাহাদত বরণ করেছেন এবং যারা পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন জুলাই ওয়ারিয়র্সদেরকে।
​ আমরা যে মনের ভাব প্রকাশ করতে চাই, নিজের ভাষায় বলতে অনেক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। মায়ের ভাষায় কথা বলার এক স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করি। যে ভাষাটা আমরা জন্মসূত্র থেকে পেয়েছি। আমাদের ওপর যখন অন্য ভাষা চাপিয়ে দেওয়া হতো তখন কিন্তু আমাদের মনের ভাব প্রকাশ করতে নিশ্চয়ই অনেক অস্থিরতা এবং অনেক বাধাগ্রস্ত হতো। আমাদের এই দীর্ঘ আন্দোলনের মাধ্যমে ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অনেক আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা আজকে স্বাধীন সুন্দর দেশ পেয়েছি। আমরা যেন তাদের কথা ভুলে না যাই।
​আমরা আরও স্মরণ করি বাংলা ভাষার কথা। যদি আমরা দেখি বিশ্বে এত দেশ রয়েছে আমাদের ভাষার অবস্থান সপ্তম। অর্থাৎ আমাদের ভাষা কত সমৃদ্ধ, অনেক সমৃদ্ধশালী ভাষা আমাদের। অনেক বিশ্বে অনেক ভাষা রয়েছে যে ভাষার নিজেদের কোন বর্ণমালা নেই। আমাদের সুন্দর বর্ণমালা রয়েছে। আমরা এই ভাষা দিয়ে মনের ভাব মিশিয়ে অনেক কথা বলতে পারি।

তিনি আরোও বলেন, ​আমরা যেমন দেখেছি যে মাইকেল মধুসূদন দত্ত যে ফ্রান্সের ভার্সাই এ বসে বাংলায় কবিতা লিখেছেন। তিনি বিদেশে অনেক কিছু চেয়েছিলেন, ফেমাস হতে চেয়েছিলেন, ইংরেজি কবি হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সবশেষে মনে করলেন যে না বাংলা এমন একটা ভাষা যেটা মায়ের নাড়ীর সাথে যুক্ত রয়েছে। তিনি লিখলেন, ‘সতত হে নদ তুমি পড় মোর মনে’। হ্যাঁ, একটা সুন্দর কবিতা লিখলেন। তো আমাদের আরও অনেক কবি-সাহিত্যিক রয়েছেন যারা এই ভাষার কথাটি মনে নিয়ে লিখেছেন এবং এটা চর্চারও অন্যতম একটা বিষয় হিসেবে দেখিয়েছেন আমাদেরকে।

এসময় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-২০২৬ উদযাপন উপলক্ষে এই আয়োজন। বৈষম্যর শিকার হয়েছিলাম আমরা ৪৭ এর পরপরই। ১৯৪৭ সালে ভারত যখন দুই ভাগ হয়ে পাকিস্তান এবং ভারত দুটো আলাদা রাষ্ট্র হলো, তখন এই প্রশ্ন আসলো যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে?

মনে রাখা ভালো যে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ)-এর জনগোষ্ঠী ছিল ৫ কোটি। বর্তমান পাকিস্তান মানে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের জনগোষ্ঠী ছিল ৩ কোটি। কিন্তু তারপরও পশ্চিম পাকিস্তানিরা চাইলো যে রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে। অদ্ভুত এই একটা বৈষম্য। ৫ কোটি মানুষের মুখের ভাষা রাষ্ট্রভাষা হবে না, ৩ কোটি মানুষের মুখের ভাষা রাষ্ট্রভাষা হতে পারে না।

তৎকালীন ছাত্রসমাজ সেই বৈষম্যের প্রতিবাদ করেছিল। অকুতোভয়ে অনেকেই প্রাণ দিয়েছিল। যার বিনিময়ে আমরা এখন আজ রাষ্ট্রভাষা বাংলায় শুধু নয়, আমরা অনেক সাবলীলভাবে সকল ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার প্রয়োগ দেখছি। সেই আত্মত্যাগের স্বীকৃতি শুধু এই বাংলাদেশের মানুষই দেয়নি, আন্তর্জাতিকভাবেও দিয়েছে। তাই আজকের দিবসটি শুধু আমাদের ভাষা দিবস নয়, এটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

আজকে আমরা এখানে বাংলাদেশে বসে যেভাবে এই দিবসটি উদযাপন করছি, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, চীন, আমেরিকা, ইউকে-র লোকেরাও সেখানে বসে এই রাষ্ট্রভাষা বাংলাকে একইভাবে তারা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে উদযাপন করছে। একজন বাঙালি হিসেবে, একজন বাংলাদেশি মানুষ হিসেবে, এই মাটির সন্তান হিসেবে এটা আমাদের অনেক গর্বের।

আমরা আশা করি, এখানে যেসকল শিক্ষার্থীবৃন্দ আছে, তারা তাদের প্রাত্যহিক জীবনে শিক্ষালব্ধ জ্ঞান দিয়ে এই বাংলাদেশকে আবারও বিশ্বের বুকে অনেক মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে, আরও সামনের দিকে যাবে। বাংলাদেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাবার জন্য শুধু এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনই শেষ নয়, নিজেকেও প্রস্তুত করতে হবে।

এ সময় আরো বক্তব্য রাখেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার, বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইদুর রহমান, জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড ইউনিটের সভাপতি আবেছউদ্দিন, চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ সিদ্দিকুর রহমান, চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম সনি।

আলোচনা সভা শেষে বিভিন্ন স্কুলের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী বিজয়ীদের মোট ১৮ জন শিক্ষার্থীর মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।

চিত্রাঙ্কন আবৃত্তি ও সংগীত প্রতিযোগিতায়,
সংগীত, (ক) বিভাগের প্রথম স্থান দখল করেছেন, চুয়াডাঙ্গা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, আবতাহী বিনতে রহমান। (ক) বিভাগের দ্বিতীয় স্থান দখল করেছেন, চুয়াডাঙ্গা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, টুসানুর রহমান বিজয়া। (ক) বিভাগের তৃতীয় স্থান দখল করেছেন, চুয়াডাঙ্গা কালেক্টর স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার্থী, ইসরাত জাহান ইয়া।

(খ) বিভাগের প্রথম স্থান দখল করেছেন, চুয়াডাঙ্গা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তাসনিয়া আজাদ বর্ণ। (খ) বিভাগের দ্বিতীয় স্থান দখল করেছেন, চুয়াডাঙ্গা ভি.জে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, সাদাত শাহরিয়ার অর্পণ। (খ) বিভাগের তৃতীয় স্থান দখল করেছেন, চুয়াডাঙ্গা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, নিলিমা তাবাছুম।

আবৃতি, (ক) বিভাগের প্রথম স্থান দখল করেছেন, চুয়াডাঙ্গা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, আবতাহী বিনতে রহমান। (ক) বিভাগের দ্বিতীয় স্থান দখল করেন, চুয়াডাঙ্গা কালেক্টর স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার্থী, তাসফিয়া তাসনিম। (ক) বিভাগের তৃতীয় স্থান দখল করেন, ড.এ আর মালিক স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার্থী, প্রীতিকা প্রেক্ষা রায়।

(খ) বিভাগের প্রথম স্থান দখল করেছেন, চুয়াডাঙ্গা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, মাহিয়া মাহি। (খ) বিভাগের দ্বিতীয় স্থান দখল করেছেন, চুয়াডাঙ্গা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, চন্দ্রিমা দেবনাথ। (খ) বিভাগের তৃতীয় স্থান দখল করেছেন, ঝিনুক মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, অহনা পিন্টু।

চিত্রাঙ্কন, (ক) বিভাগের প্রথম স্থান দখল করেছেন, চুয়াডাঙ্গা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, সমাপ্তী শান্তারা। (ক) বিভাগের দ্বিতীয় স্থান দখল করেছেন, চুয়াডাঙ্গা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শ্যামন্তী শান্তারা। (ক) বিভাগের তৃতীয় স্থান দখল করেছেন, বাংলাদেশ নৌবাহিনী স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার্থী, মোহাম্মদ হোসাইন আল মাশরুর।

(খ) বিভাগের প্রথম স্থান দখল করেছেন, ভি.জে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শান্তনু ইসলাম (অন্তু)। (খ) বিভাগের দ্বিতীয় স্থান দখল করেছেন, চুয়াডাঙ্গা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, নাবীহা তাহসীন নওমী। (খ) বিভাগের তৃতীয় স্থান দখল করেছেন, ঝিনুক মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, মরিয়ম খাতুন।

এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) নয়ন কুমার রাজবংশী, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক তারিক উজ জামান, সিভিল সার্জন হাদী জিয়াউদ্দিন আহমেদ, সহকারি কমিশনার আলাউদ্দিন আল আজাদ, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক দীপক কুমার সাহা, জেলা তথ্য অফিসার শিল্পী মন্ডল, চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা মন্ডলী, ছাত্র-ছাত্রী বৃন্দ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও গণমাধ্যম কর্মীরা।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।