ভ্যানিলাসহ সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে সফলতার মুখ দেখছেন চুয়াডাঙ্গার বেগমপুরের উদ্যোমী কৃষক হুমায়ন কবীর

মুন্না রহমান, স্টাফ রিপোর্টার
কৃষিতে বৈচিত্র্য ও আধুনিকতার ছোঁয়া এনে সফলতার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বেগমপুর কলোনিপাড়ার হুমায়ন কবীর ফরাজী (৫১)। সাধারন সবজি ও ফল চাষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে চুয়াডাঙ্গায় প্রথমবারের মতো ‘ভ্যানিলা’ চাষ করে তিনি এলাকায় সাড়া ফেলেছেন। ৪ বছর নিবির পরিচর্যার পর এবার ভ্যানিলার গাছে ফুল থেকে ফল ধরেছে। বরবটির মত দেখতে বিদেশি এ ফল দেখতে অনেকেই ভিড় করছেন তার খামারে। উদ্যোমি কৃষক হুমায়ন কবীর তার সমন্বিত খামারের নাম দিয়েছে “নিউ কামাল এগ্রো”। ১৮ বিঘা জমির উপর গড়ে তোলা হয়েছে সমন্বিত কৃষি খামার।  বর্তমানে তার খামারে  চাষ হচ্ছে ভ্যানিলা, কাশ্মিরি কলা, পেঁপে ও ড্রাগনের মত ফল। এছাড়াও পালন করা হচ্ছে ছাগল, দুম্বা, ভেড়া ও গরু।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার দর্শনা থানার বেগমপুর গ্রামের মৃত কামাল উদ্দীন ফরাজী ও রাশেদা বেগমের ৫ ছেলে ও ২ মেয়ের মধ্যে সেজো ছেলে হুমায়ন কবীর। তিনি দুই সন্তানের জনক। তার বড় ছেলে জাবের হুসাইন চুয়াডাঙ্গা কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র এবং ছোট ছেলে আবির হুসাইন চুয়াডাঙ্গা শহরের চাইল্ড ফেয়ার হোমের নার্সারির শিক্ষার্থী। স্ত্রী শাহনাজ খাতুন রুমি গৃহিনী।
চুয়াডাঙ্গা জেলা শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দুরে বেগমপুর কলোনীপাড়া গ্রাম। গ্রামের রাস্তার ধারে হুমায়নের “নিউ কামাল এগ্রো” খামারে গিয়ে দেখা যায়, খামারের একপ্রান্তে থাকার জন্য দুটি রুম তৈরী করা হয়েছে। এর একপাশে ডেইরী খামার ও আরেক পাশে দুম্বা, ছাগল, ভেড়ার খামার। আরো একটু সামনে এগোলেই ভ্যানিলা বাগান। ১০ কাঠা জায়গা নেট দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। কিছুটা স্যাত সেতে জায়গা। নেটের ভিতরে ৬০০/৭০০ পিলারে লতায়-পাতায় ঝুলছে ভ্যানিলা গাছ। গাছের আগার দিকে ধরা পড়েছে ভ্যানিলা। প্রতিটি ফল ৮/১০ ইঞ্চি লম্বা। অনেকটা বরবটি সবজির মতো দেখতে সবুজ রংয়ের ভ্যানিলা ফল। আর কিছুদিন পর হালকা ব্রাউন রং ধারন করলে গাছ থেকে ফলটি উত্তোলন করা যাবে। ভ্যানিলা বাগানের পাশে রয়েছে ড্রাগন ও কাশ্মিরী কলা।
আজকের চুয়াডাঙ্গার সাথে আলাপচারিতায় হুমায়ন কবীর জানান, কর্মজীবনে তিনি দীর্ঘদিন আম এবং নানা রকম ফলের ব্যবসা করেছেন। ঢাকার কাওরান বাজারে তার বাবার কুষ্টিয়া ভান্ডার নামে একটি ফলের আড়ৎ রয়েছে। সেখান থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে ২০ বছর পূর্বে তিনি নিজেই আধুনিক ফল চাষে নামার সিদ্ধান্ত নেন। সেই থেকেই তিনি নিজ জেলায় শুরু করেন নানান রকম ফলের চাষ। শুরুতে তিনি লিচু, ড্রাগন, মালবেরি ও অ্যাভোকাডোর চাষ শুরু করেন। এরপর চার বছর পূর্বে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে পেনিফোলিয়া জাতের ভ্যানিলার চারা কিনে আনেন। পরীক্ষামূলকভাবে নিজের ১০ কাঠা জমিতে পিলার করে গ্রিন হাউস প্রক্রিয়ায় শুরু করেন চাষ। চার বছরে পুরো চাষ প্রক্রিয়ায় তার খরচ হয়েচে প্রায় ৯ লাখ টাকা। নানান চড়াই উৎরাই পেরিয়ে বর্তমানে সেই ভ্যানিলার গাছে প্রথমবারের মতো ফুল থেকে ফল এসেছে। চলতি বছরে তার বাগানের ভ্যানিলা বিক্রি করে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা আয় হবে বলে তিনি আশা করছেন।
হুমায়ুন কবীর আরো বলেন, ১০ কাঠা জমিতে এই ভ্যানিলা চাষ করেছি। ২০২২ সালেই এই চারাগুলো আমি সংগ্রহ করি। ইউটিউবে এবং ভ্যানিলার প্রজেক্ট প্রোগ্রামে আমি অংশগ্রহণ করি। প্রথমত পার্শ্ববর্তী দেশে গিয়ে এই চারাগুলো দেখি ও রোপনের পদ্ধতি জেনে নিই। সেখানে থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমি চারাগুলো ২০২২ সালে লাগিয়েছি। এখন এই গাছগুলোতে ফুল-ফল এসেছে। এই ফলগুলো এক থেকে দেড় মাস পরে উত্তোলন করা যাবে। ভ্যানিলার ভিতরে রং অনেকটা সুরমার কালারের মত। চলতি মৌসুমে তার জমি থেকে ১২০ কেজির মতো ভ্যানিলা উৎপাদন হবে। বর্তমানে বাজারে প্রতিকেজি ভ্যানিলা প্রকার ভেদে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা বিক্রি হচ্ছে। যদি বাজার ঠিকমতো পাই, আমরা ৭ থেকে ৮ লাখ টাকায় ফলগুলো বিক্রি করতে পারবো। ভ্যানিলা চাষে অনেক ধৈর্য লাগে।  আমার ভ্যানিলা বাগান পরিচর্যার জন্য  দৈনিক ৪ জন লেবার নিয়োজিত রয়েছে। এছাড়াও অন্যান্য কাজে আরো ৬/৭ জন লেবার নিয়োগ করা হয়। তবে এটি খুব সম্ভাবনাময় একটি ফসল। বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে ভ্যানিলা চাষ করা হলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে এটি বিদেশেও রপ্তানি করা যাবে।
ভ্যানিলার চাষ প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি আরো জানান, বাংলাদেশের আবহাওয়া ভ্যানিলা চাষের জন্য পুরোপুরি উপযোগী নয়। তবে গ্রীন হাউজ করে এটি চাষ করা সম্ভব। ভ্যানিলা চাষের জন্য সহনীয় তাপমাত্রা ১৬ থেকে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস এর মধ্যে থাকতে হয় এবং ছায়াযুক্ত স্থানে ভ্যানিলা চাষ করতে হয়। আমি ২০২২ সালে এক লাখ টাকা খরচ করে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে ১৫০ মিটার ভ্যানিলা লতা নিয়ে আছি। পরে সেগুলো একটি করে গিট রেখে ছোট ছোট করে কেটে প্রায় হাজার খানেক চারার পাতো দিই। ৪ মাস পাতো দেওয়ার পর সেগুলো রোপন করা হয়। এর আগে বেলে-দোঁআশ মাটি ও জৈব সার মিশিয়ে মাটি তৈরি করেন। ভ্যানিলার পাতো সেই মাটিতে রোপন করা হয়। ভ্যানিলা স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশের ফসল হওয়ায় প্রতিনিয়ত এখানে পানি স্প্রে করতে হয়। ভ্যানিলা গাছ আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে, এর লতা-পাতা আশে পাশে ছড়িয়ে পড়ছে। ভ্যানিলা গাছ রোপনের ৪/৫ বছর ফল দিতে শুরু করে। বছরে দুইবার ফল ধরে। সেপ্টেম্বর/অক্টোবর সময়ে ফলের পরিমাণ বেশি থাকে। ফল উত্তোলনের পর এর ডগা কেটে পাতু দিতে হয়। আর এই পাতু জমিতে রোপন করা যায়।
ভ্যানিলায় তেমন একটা রোগ বালাই দেখা যায় না। তবে কিছু ছত্রাকনাশক ও কীটনাশক প্রয়োগে হালকা কিছু রোগ বালাই হলে তা দমন করা যায়। এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যেই ভ্যানিলা গাছে ফুল আসে। এরপর পরিচর্যা করলে খুব দ্রুতই ফুল থেকে ফলে রূপান্তরিত হয়। অক্টোবর মাসের মধ্যেই ফলগুলো পরিপক্ক হয়ে যাবে। পরে ফল উত্তোলনের পর ৬০ থেকে ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় তিন মিনিট করে শেকিং বা সেদ্ধ করা হয়। এভাবে তিন বার সেকিং করা হয়। তারপর এই সেদ্ধ ফলগুলো রোদে শুকিয়ে বাজারজাত করা হয়।  প্রতি কেজি শুকনো ভ্যানিলা ৩০/৪০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন পাঁচতারকা হোটেল ও বড় বড় ফার্মাসিটিক্যালস কোম্পানিগুলো ভ্যানিলার ক্রেতা।
খামারে কর্মরত শ্রমিক মহাসিন আলী বলেন, ভ্যানিলা চাষে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। ছায়াযুক্ত স্থানে স্যাতস্যাঁতে পরিবেশে ভ্যানিলা ভালো হয়। তাই প্রতিনিয়ত এই ভ্যানিলা গাছগুলোতে আমি পানি দিয়ে থাকি। তাছাড়া নিয়মিত গাছের গোড়া পরিষ্কার করতে হয় এবং লতাগুলো পিলারে উঠিয়ে দিতে হয়। কোন প্রকার রোগ বালাই ছত্রাক দেখা দিলে বালাইনাশক স্প্রে করতে হয়। চার বছর পরিশ্রম করে বর্তমানে ভ্যানিলা ফল ধরেছে। আমরা আশা করছি আর কয়েক মাসের মধ্যেই এই ফল পরিপক্ক হবে এবং আমরা উত্তোলন করতে পারব।
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মাসুদুর রহমান সরকার বলেন, সদর উপজেলায় বেগমপুর ইউনিয়নের কলোনীপাড়ায় হুমায়ুন কবির ফরাজী একজন উদ্যোক্তা কৃষক। উনি নিজে উদ্যোগী হয়ে এখানে ১০ কাঠা জমিতে ভ্যানিলা চাষ করেছেন। চার বছর পরে এবারে ফুল-ফল এসেছে এবং আশা করি আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যেই উনি সব ফল সংগ্রহ করতে পারবেন। তবে এই বিষয়গুলোর ব্যাপারে আসলে যে টেকনোলজি আছে, এই টেকনোলজিগুলোর সম্পর্কে আরো যদি একটু আমরা জানতে পারি বা আমাদের গবেষকরা যদি এটি নিয়ে আরো একটু গবেষণা করে ভবিষ্যতে এটির কিন্তু সম্প্রসারণ সম্ভব।  তিনি আরোও বলেন, যেহেতু ভ্যানিলা একটি অত্যন্ত উচ্চমূল্যের ফসল, এটা যদি আমরা সম্প্রসারণ ঘটাতে পারি, আমাদের দেশের চাহিদা যেটুকু আছে সেটুকু আমরা পূরণ করে দেশের বাইরেও কিন্তু আমরা রপ্তানি করতে পারি। রপ্তানি করলে সেখান থেকে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হবে। আবার পাশাপাশি বাইরে থেকে যে ভ্যানিলা আমরা আমদানি করি সেখানে যে পয়সাটি আমাদের লাগে সেটিও লাগবে না। এইখানে দেখা যাবে যে আমাদের বেশ কিছু লোকের কিন্তু কর্মসংস্থান তৈরি হবে। আমরা কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তর চাই যে আসলে উচ্চমূল্যের ফসল যেগুলিই থাকুক সেটি যেন আমাদের এখানে প্রপারলি আমরা চাষ করতে পারি এবং সেটি সম্প্রসারণ ঘটাতে পারি। সেই আলোকেই আমি আশাবাদী যে এটি সামনে সম্প্রসারিত হবে।
হুমায়ুন কবীরের মতো নতুন নতুন উদ্যোক্তারা সনাতন চাষের গণ্ডি পেরিয়ে ভ্যানিলা ও বিদেশি ফল চাষে এগিয়ে এসে দেশের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত করবে এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।