অনলাইন ডেস্ক
মদিনার মাটিতে যখন রহমতের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) পা রাখলেন, তখন চারদিক থেকে ছুটে এল মানুষ। প্রিয়জনকে একনজর দেখার জন্য ভিড় জমান তৎকালীন ইহুদি পণ্ডিত ও পরবর্তী সময়ে বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.)। নবীজির পবিত্র মুখমণ্ডলের দিকে তাকিয়েই তার মনে হয়েছিল, এ চেহারা কখনো কোনো মিথ্যাবাদীর হতে পারে না। সেই প্রথম সম্মিলনে নবীজি (সা.) উম্মতকে যে অমূল্য বাণী ও চারিত্রিক নির্দেশিকা দিয়েছিলেন, তা মানবজাতির শান্তি ও মুক্তির চিরন্তন সোপান।
নবীজির প্রথম ঐতিহাসিক উপদেশ ও তার পটভূমি
একজন আদর্শ সমাজ সংস্কারক হিসেবে নবীজি (সা.) কেবল তত্ত্বের কথা বলেননি, বরং যা বলতেন তা নিজের জীবনে শতভাগ বাস্তবায়ন করে দেখাতেন। তার সেই সচ্ছল ও আন্তরিক আচার-আচরণই মদিনার নতুন সমাজে মানুষের মনে গভীর আস্থা তৈরি করেছিল। মদিনায় পৌঁছানোর পর তিনি যে সোনালি উপদেশগুলো দিয়েছিলেন, তা মানবকল্যাণ ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনবদ্য দলিল। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) সেদিন ইরশাদ করেছিলেন—
يَا أَيُّهَا النَّاسُ، أَفْشُوا السَّلَامَ، وَأَطْعِمُوا الطَّعَامَ، وَصِلُوا الْأَرْحَامَ، وَصَلُّوا بِاللَّيْلِ وَالنَّاسُ نِيَامٌ، تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ بِسَلَامٍ
‘হে মানুষ! তোমরা সালামের প্রসার ঘটাও, ক্ষুধার্তকে খাবার খাওয়াও, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখ এবং মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন রাতে নামাজ আদায় কর; তাহলে তোমরা নিরাপদে ও শান্তিতে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।’ (তিরমিজি ২৪৮৫, মুসনাদে আহমাদ ২৩৪০৮)
১. ক্ষুধার্তকে খাবার খাওয়ানো: মানবতা ও শান্তির প্রথম সোপান
খাদ্য মানুষের বেঁচে থাকার অপরিহার্য উপাদান। মানুষের ক্ষুধার কষ্ট দূর না করে কখনোই একটি সুন্দর, অপরাধমুক্ত সমাজ গড়া সম্ভব নয়। পেটে ক্ষুধা থাকলে মানুষের মধ্যে যেমন অশান্তি দানা বাঁধে, তেমনি সমাজের অবস্থাও নাজুক হয়ে পড়ে। তাই পারস্পরিক দয়া ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার প্রথম শর্ত হলো ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়া। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা সৎ ও জান্নাতি বান্দাদের এই গুণের প্রশংসা করে ইরশাদ করেছেন—
وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَى حُبِّهِ مِسْكِينًا وَيَْتِيمًا وَأَسِيرًا
‘আর তারা আল্লাহর ভালোবাসায় অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দীকে খাবার খাওয়ায়।’ (সুরা আল-ইনসান: আয়াত ৮)
২. সালামের প্রচলন: পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি
রাস্তায়, কর্মস্থলে বা সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে আন্তরিকভাবে সালাম দেওয়া মানুষের মধ্যকার দূরত্ব ঘুচিয়ে দেয়। অজ্ঞতা ও ভুল বোঝাবুঝি থেকেই মূলত সমাজে বিদ্বেষের জন্ম হয়। অথচ সালামের মাধ্যমে একে অপরের জন্য আল্লাহর কাছে শান্তি ও নিরাপত্তার দোয়া করা হয়, যা মনের জমে থাকা বরফ গলিয়ে দেয় এবং পারস্পরিক ভালোবাসার সেতুবন্ধন তৈরি করে। হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও স্পষ্ট করে বলেছেন—
لَا تَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا، وَلَا تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا، أَوَلاَ أَدُلُّكُمْ عَلَى شَيْءٍ إِذَا فَعَلْتُمُوهُ تَحَبَبْتُمْ؟ أَفْشُوا السَّلَامَ بَيْنَكُمْ
‘তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না যতক্ষণ না ইমান আনবে, আর ততক্ষণ পর্যন্ত ইমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ না একে অপরকে ভালোবাসবে। আমি কি তোমাদের এমন একটি কাজের কথা বলে দেব না, যা করলে তোমাদের পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে? তা হলো—তোমরা নিজেদের মধ্যে সালামের প্রসার ঘটাও।’ (মুসলিম ৫৪)
সুত্র: যুগান্তর



