মুন্না রহমান
চুয়াডাঙ্গায় বেড়েই চলেছে মাছ ও ডিমের দাম। গত কয়েক মাস ধরে সব ধরনের মাছ ও ডিমের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বিপাকে পড়েছে নিন্ম আয়ের মানুষ। এ কারনে মাছে ভাতে বাঙ্গালীর যে প্রবচন সেটা অনেকে ভূলতে বসেছে। অপরদিকে ভরা মৌসুমে ইলিশ মাছ সাধারণ ক্রেতাদের একেবারে নাগালের বাইরে চলে গেছে। ইলিশ মাছের স্বাদ পেতে হলে অনেকের অর্ধেক মাসের বেতনের টাকা ব্যয় করতে হবে। তবে স্থিতিশীল রয়েছে বেশিরভাগ সবজি-মুরগী বাজার।
গতকাল সোমবার চুয়াডাঙ্গা শহরের বড় বাজার নিচের বাজার ঘুরে দেখা যায়, কয়েক মাস ধরেই অধিকাংশ সবজির দাম স্থিতিশীল থাকলেও কিছু কিছু সবজির দাম কেজি প্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। খুচরা পর্যায়ে বেগুন ৮০ টাকা, কাকরোল ৬০ টাকা, সীম ১৫০ টাকা, টমেটো ১২০ টাকা, লাউ প্রতিপিস ৪৫ থেকে ৫০ টাকা, গাজর ১০০ থেকে ১২০ টাকা, ঢেঁড়স ৪০ টাকা, ফুলকপি ৭০ টাকা, করলা ৫০ টাকা, মুলা ২৫ থেকে ৪০ টাকা, কচু ৪০ টাকা, পেঁয়াজ ৪০ থেকে ৫০ টাকা, রসুন ৮০ টাকা থেকে ১১০ টাকা, কাঁচা মরিচ ৬০ টাকা, পটল ৪৫ টাকা, ক্যাপসিকাম ৫০০ টাকা, আলু ২৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
দাম বেড়েছে সব ধরনের মাছের। মাছের রাজা ইলিশ বিক্রি হচ্ছে হাফ কেজি থেকে ১ কেজি ওজনের ২০০০/৩০০০ টাকা কেজি, তেলাপিয়া মাছ বিক্রি হচ্ছে ২২০ থেকে ২৪০ টাকা কেজি, রুই ৩৮০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি, সিলভার কার্প ২২০ থেকে ২৪০, পাঙ্গাস ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি, কাতলা ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি, বিদেশি শিং মাছ বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি এবং গলদা চিংড়ির দাম এক হাজারের উপরে, একইভাবে ব্রয়লার মুরগী বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা, সোনালী ৩০০ টাকা, প্যারিস ৩৮০ টাকা, লেয়ার ৩৭০ টাকা, এবং দেশি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৬০০ টাকা কেজি দরে। গত সপ্তাহের তুলনায় এ সপ্তাহে প্যারিস ও লেয়ারের দাম কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
এদিকে স্থিতিশীল আছে গরু ও খাসির মাংসের দাম। গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে এগারোশো থেকে বারোশো টাকায়। তবে স্বল্প আয়ে ক্রেতারা এ সকল মাংসের দিকে ঝুঁকছেন কম। সাধ থাকলেও সাধ্য নেই বলে জানিয়েছেন অনেকেই। ক্রেতার অভাবে দীর্ঘক্ষণ অবসর সময় পার করেছেন মাংস বিক্রেতারা।
দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধিতে ক্রেতাদের মাঝে দেখা গেছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। গত মাসের তুলনায় পণ্যের দাম কমবে বলে অনেকেই আশায় ছিলেন, তবে পণ্যের দাম না কমায় হতাশা বিরাজ করছে ক্রেতাদের মাঝে।
ক্রেতারা বলছেন, প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের এমন ঊর্ধ্বগতিতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। দেশের চট্টগ্রাম সিলেট এবং ঢাকার কিছু অঞ্চলে বন্যা হওয়াই সেই প্রভাব পড়ছে চুয়াডাঙ্গার বাজারগুলোতে। প্রায় প্রতিটি পণ্যের দামই ২০ থেকে ৩০ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। সবজি ও মাছের দাম কমার আশায় থাকলেও দাম স্থিতিশীল থাকায় হতাশা দেখা গেছে ক্রেতাদের মাঝে।
খুচরা সবজি ব্যবসায়ী রতন আলী বলেন, বর্ষা আসলে জিনিসের দাম বাড়ে। তবে দাম কমার আশঙ্কা থাকলেও দাম কিন্তু কমেনি। অধিকাংশ পণ্যের দামে স্থিতিশীল রয়েছে। কিছু কিছু সবজির দাম বেড়েছে। বর্ষা আসলে জিনিসের দাম বাড়ে। তাছাড়া দেশের কিছু কিছু জায়গায় বন্যা হওয়ায় অনেক জমি জায়গা ডুবে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তাই আমাদের অঞ্চলের সবজিগুলো ঢাকা ও চিটাগাং থেকে মানুষ এসে সব নিয়ে যাচ্ছে। তারই প্রভাব পড়ছে আমাদের আঞ্চলিক বাজারগুলোতে।
পাইকারি সবজি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শামীম রেজা বলেন, দেশের বন্যা পরিস্থিতির কারণে পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের সবজি মোকাম থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। আমরা বেশি দামে কিনলে স্বাভাবিকভাবেই খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছেও বেশি দামে বিক্রি করতে হয়।
মাছ বিক্রেতা কাজল বলেন, আমাদের চুয়াডাঙ্গাতে মাছের দাম প্রচুর বেশি। রুই মাছ প্রতি কেজি ৪০০ টাকার বেশি বিক্রি হচ্ছে। তেলাপিয়া মাছ কৈ মাছ ২২০-২৩০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। আরো বিভিন্ন রকমের মাছ আছে যেমন চিংড়ি মাছ এইগুলো ২ হাজার টাকার বেশি বিক্রি হচ্ছে। সব মাছের দাম বেশি হওয়ায় আমাদের বেচাকেনা অনেক কম।
মুরগি বিক্রেতা তুহিন হোসেন জানান, ব্রয়লার মুরগি বর্তমানে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সোনালী ৩০০ টাকা এবং দেশি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৬০০ টাকা কেজি দরে। দাম বৃদ্ধি পেয়েছে প্যারিস ও লেয়ার মুরগির। প্যারিস বিক্রি হচ্ছে ৩৮০ টাকা যা গত সপ্তাহেছিল ৩৫০ টাকা, লেয়ার বিক্রি হচ্ছে ৩৭০ টাকা যা গত সপ্তাহ ছিল ৩৫০ টাকা। দেশের বন্যা কবলিত অঞ্চলে খাদ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এ সকল পণ্যের দাম বৃদ্ধি হয়েছে বলে জানান তিনি।
ক্রেতা সোহেল হোসেন বলেন, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম প্রায় মাসখানেক ধরে একই রকম রয়েছে। কিছু কিছু সবজির দাম এবং মাছের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। যদি সবজির দাম এভাবেই বাড়ে, তাহলে অনেকেই প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে হিমশিম খাবে। অনেকেই ভেবেছিলাম হয়তো বর্ষা কমার সাথে সাথে জিনিসপত্রের দামও কমে যাবে।
এ বিষয়ে কাঁচামাল আড়ৎ কমিটির সভাপতি শাহ আলম বলেন, বিভিন্ন জায়গায় অতি বৃষ্টির কারণে কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে তাছাড়া অধিকাংশ পণ্যের দামই একই রকম আছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় বন্যা হচ্ছে যার কারণে খাদ্য সংকট দেখা দিচ্ছে। পাইকারি পর্যায়ে দাম কম থাকলে অনেক সময় খুচরা পর্যায়ে গিয়ে দাম কিছুটা বৃদ্ধি পায়। তবে আশা করা যাচ্ছে শীতকালীন সবজি বাজারে আসতে শুরু করলে অনেক সবজির দামই কমে যাবে।
এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা বাজার মনিটরিং কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম বলেন, দেশের চট্টগ্রাম সিলেট এবং ঢাকার কিছু অঞ্চলে বন্যা হওয়ায় তার প্রভাব চুয়াডাঙ্গার বাজারগুলোতেও পড়েছে। সবজি, মাছ এবং মুরগির দাম খুব একটা বৃদ্ধি পায়নি। অধিকাংশ পণ্যের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। তবে বৃদ্ধি পেয়েছে ভোজ্য তেল ও আটার দাম। চুয়াডাঙ্গার ভালাইপুর এবং সরোজগঞ্জ থেকে বিপুল পরিমাণ সবজি ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাজার গুলোতে চলে যাচ্ছে। যার কারনে চুয়াডাঙ্গায় চাহিদার তুলনায় যোগান কম হচ্ছে। সামনে শীতকালীন সবজি উঠতে শুরু করলে এ সকল পণ্যের দাম অনেকটাই কমে যাবে বলে আশা করছি।
চুয়াডাঙ্গায় মাছ-ডিমের দাম বেড়েই চলেছে, স্থিতিশীল রয়েছে সবজি-মুরগী বাজার ভরা মৌসুমেও নাগালের বাইরে ইলিশ, চাপে নিম্ন-মধ্যবিত্ত



