বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস: শিশুর অধিকার, কর্মশিক্ষা ও ডিজিটাল যুগের নতুন চ্যালেঞ্জ

কৃষিবিদ মনিরুজ্জামান বাবুল

১২ জুন বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। এ দিবসের মূল লক্ষ্য শিশুদের শোষণমূলক ও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম থেকে মুক্ত রাখা এবং তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক বিকাশ নিশ্চিত করা। কারণ শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের রাষ্ট্রনায়ক, বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা, কৃষিবিদ ও প্রযুক্তিবিদ।

তবে শিশুশ্রম প্রতিরোধ বলতে শিশুদের সব ধরনের কাজ থেকে দূরে রাখাকে বোঝায় না। জীবিকা নির্বাহের জন্য শ্রমে নিয়োজিত করা যেমন অনাকাঙ্ক্ষিত, তেমনি বয়সোপযোগী কর্মশিক্ষা, পারিবারিক দায়িত্ববোধ ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ড শিশুদের আত্মনির্ভরতা, শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এক সময় বিদ্যালয়ভিত্তিক কর্মশিক্ষার বাস্তব চর্চা ছিল। আশির দশকে শিক্ষার্থীরা মাসে অন্তত একদিন বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় অংশ নিত, খেলার মাঠের আগাছা পরিষ্কার করত এবং আনন্দের সঙ্গে স্বেচ্ছাশ্রমে যুক্ত হতো। বার্ষিক বনভোজন, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে রান্নাবান্না ও আয়োজনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা বাস্তবজীবনের নানা দক্ষতা অর্জন করত। বয়সভেদে ছোটদের আত্মপরিচর্যা, স্কুলগামী শিশুদের পরিবেশ ও সামাজিক সেবায় অংশগ্রহণ এবং কিশোরদের স্বেচ্ছাসেবা ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক কাজে সম্পৃক্ত করা তাদের ব্যক্তিত্ব বিকাশে সহায়ক হতে পারে।

কিন্তু বর্তমান সময়ে শিশু-কিশোরদের জন্য নতুন এক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। একসময় সমাজের বড় ব্যাধি ছিল ধূমপান; পরে গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিলসহ নানা মাদক যুবসমাজকে গ্রাস করার চেষ্টা করেছে। এসব থেকে তরুণদের রক্ষায় রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজকে দীর্ঘ সংগ্রাম করতে হয়েছে। আজ সেই চ্যালেঞ্জ নতুন রূপে হাজির হয়েছে ডিজিটাল আসক্তির মাধ্যমে। ই-সিগারেট, অনলাইন জুয়া, বিপজ্জনক ভার্চুয়াল গেম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিনির্ভরতা এবং নানা ধরনের ডিজিটাল প্রলোভন শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশের জন্য নতুন ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।

যে বয়সে সৃজনশীলতা, খেলাধুলা ও জ্ঞানচর্চায় সময় ব্যয় হওয়ার কথা, সেই বয়সের অনেকেই অলস সময় কাটাচ্ছে পর্দার সামনে। ফলে প্রয়োজন জাতীয় পর্যায়ে সচেতনতা, গবেষণা ও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ। অতীতে যেমন মাদকবিরোধী প্রতিষ্ঠান ও আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তেমনি ডিজিটাল আসক্তি, অনলাইন জুয়া ও প্রযুক্তির অপব্যবহার প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ সময়ের দাবি।

অন্যদিকে শিশু-কিশোরদের অলস সময়কে সৃজনশীল কর্মযজ্ঞে যুক্ত করতে হবে। বিজ্ঞানচর্চা, তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা, উদ্ভাবনী কার্যক্রম, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও কমিউনিটি সেবায় তাদের সম্পৃক্ত করতে হবে। বিশেষত সুস্থ শৈশব রক্ষায় হেলদী লাইফষ্টাইল চর্চা তাদের চেতনায় সংযোগ ঘটাতে হবে, পারিবারিক ও সামাজিক মুল্যবোধের পাশাপাশি ধর্মীয় সংস্কৃতির উম্মেষ ঘটাতে হবে।

চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো সৌজন্য তা ও শিষ্টাচারের চর্চা র মতো প্রযুক্তি শিক্ষাকেও শৈশব থেকেই গুরুত্ব দিয়েছে। সেকারণে তারা সভ্যিক কর্মকাণ্ডেও জাতিগতভাবে ক্রমোন্নতিতে আজ! আমাদেরও পাঠশালার সূতিকাগার থেকেই সাধারণ শিষ্টাচার শিখনে মনোযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি
শিশুদের প্রযুক্তির ভোক্তা নয়, বরং উদ্ভাবক ও সৃষ্টিশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।

বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবসে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক—শিশুকে শোষণমূলক শ্রম থেকে মুক্ত রাখব, কিন্তু কর্মের মর্যাদা, দায়িত্ববোধ ও সৃজনশীলতার শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করব না। নিরাপদ শৈশব, মানবিক মূল্যবোধ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও জীবনমুখী কর্মশিক্ষার সমন্বয়েই গড়ে উঠবে আগামী দিনের গর্বিত, দক্ষ ও দায়িত্বশীল প্রজন্ম।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।