স্টাফ রিপোর্টার/তিতুদহ প্রতিনিধি
খুলনা নগরীতে ছাত্রাবাসে ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগ তুলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার দিবাগত রাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে খাজা খানজাহান আলী আবাসিক হলের পেছনে ইসলামনগর রোডের একটি চারতলা ছাত্রাবাসে এ ঘটনা ঘটে। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত আজমুল হোসেন (২১) চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানার বড় শলুয়া গ্রামের কুতুব উদ্দিনের ছেলে। তিনি খুলনার বেসরকারি নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম সেমিস্টারের ছাত্র ছিলেন। গত ১০ সেপ্টেম্বর তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চারতলা ভবনটি পুরোপুরি ছাত্রদের মেস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেখানে ৫০ থেকে ৬০ জন শিক্ষার্থী থাকেন। প্রায় এক বছর আগে আজমুল চারতলার ডি-৮ নম্বর কক্ষ ভাড়া নেন। মেসের ম্যানেজার মেহেদী থাকেন ডি-২ নম্বর কক্ষে।
মেসের কয়েকজন শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের বরাত দিয়ে জানা গেছে, শুক্রবার রাতে মেহেদীর ভাত খেয়ে ফেলেন আজমুল। এ নিয়ে ভাত চুরির অভিযোগ তুলে মেহেদীসহ মেসের কয়েকজন শিক্ষার্থী ও কয়েকজন বহিরাগত তাকে ছাদে নিয়ে মারধর করেন বলে অভিযোগ। পরে ছাদ থেকে কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনে আশপাশের বাসিন্দারা গলিতে আজমুলকে পড়ে থাকতে দেখেন। মেসের অন্য শিক্ষার্থীরা তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের এক চিকিৎসক গণমাধ্যমকে জানান, শুক্রবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে কয়েকজন যুবক গুরুতর আহত অবস্থায় আজমুলকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং দুই পা ভাঙা ছিল। মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর মেসের শিক্ষার্থীরা হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে থেকে চলে যান বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়।
মেসের বুয়া ফাতেমা বলেন, এর আগেও আজমুলের বিরুদ্ধে টাকা ও ল্যাপটপ চুরির অভিযোগ ছিল। শুক্রবার রাতে ভাত চুরির অভিযোগে তাকে মারধর করা হলেও তিনি বাধা দিয়ে তা ঠেকাতে পারেননি।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত খুবির সাবেক এক শিক্ষার্থী জানান, খাবারসহ বিভিন্ন জিনিস চুরির অভিযোগে আজমুলকে ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছিল। তার কাছ থেকে গেঞ্জি, শার্ট, প্যান্ট, জুতা ও টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করানো হয় বলেও তিনি দাবি করেন। একপর্যায়ে লাউডস্পিকারে আজমুলকে তার বাবার সঙ্গে কথা বলানো হয়। তখন সে বাবাকে চুরির অভিযোগে ধরা পড়ার কথা জানায়। পরে ওই শিক্ষার্থীকে তার বাবার সঙ্গে কথা বলিয়ে দ্রুত খুলনায় আসতে বলা হয়। নিহতের পরিবারের দাবি, মারধরের পর আজমুলের বাবার কাছে ফোন দিয়ে চুরির ক্ষতিপূরণ হিসেবে এক লাখ টাকা দাবি করা হয়।
নিহত আজমুলের বাবা কুতুব উদ্দিন বলেন, আমার দুই ছেলে। বড় ছেলে আজমুল। এক বছর আগে লেখাপড়ার জন্য বাড়ি থেকে খুলনায় আসে। আজমুল ২০২৫ সালে ও কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেনি। মাত্র ১০ দিন আগে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বাড়ি যায়। শুক্রবার দুপুরে বাড়ি থেকে বের হয়ে বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে খুলনায় আসে। রাত ৯টার দিকে ফোনে তাদের সঙ্গে আজমুলের শেষ কথা হয়। তখন সে বলেছিল, আমি ভালো আছি। তোমরা আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না, বলেন কুতুব উদ্দিন।
তিনি বলেন, রাত ১২টার পরে আমার ছেলের মোবাইল ফোন দিয়ে অন্য একটি ছেলে ফোন দেয়। বলে, আপনার ছেলে ঝামেলা করেছে। তাকে পেতে হলে দ্রুত এক লাখ টাকা নিয়ে আসেন। টাকা না আনলে আপনার ছেলেকে পাবেন না।
তখন আমি বলি, আমরা গরিব মানুষ, এক লাখ টাকা কোথায় পাব? তখন সে বলে, আপনি কী করেন? আমি তাকে বলি, আমি কৃষিকাজ করি। তখন সেই ছেলে আবার বলে, আপনি দ্রুত চলে আসেন। তখন আমি বলি, আমি ট্রেনে দ্রুত আসছি। সে বলে, আপনি ট্রেনে আসবেন, না বাসে আসবেন, না প্লেনে আসবেন, সেটা আপনার ব্যাপার। তারপর সকালে এসে দেখি, আমার ছেলে আর বেঁচে নেই।
কান্না জড়িত কণ্ঠে কুতুব উদ্দিন বলেন, আমি কার কাছে এ বিচার দিব? আমি কারো কাছে বিচার দিব না। আমরা গরিব মানুষ। বাড়ি অনেক দূরে। আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম।
নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কানাই লাল সরকার জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে পরিবারকে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।
নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কানাই লাল সরকার জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে পরিবারকে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পরিবারকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে বলেও জানান তিনি।
হরিণটানা থানার ওসি মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। আজমুলের বাবা মামলা না করলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে। মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার হুমায়ুন কবির বলেন, এ ঘটনায় আইনগতভাবে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক পরিচালক অধ্যাপক মো. সালাউদ্দিন বলেন, ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার বাইরে ঘটেছে। তাই সেখানে সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো এখতিয়ার নেই। তবে ঘটনাটি জানার পর থেকে পুলিশকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে আজমুলের মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। রাত ৯টার দিকে মরদেহটি দর্শনার বড় শলুয়া গ্রামের নিজ বাড়িতে পৌঁছালে এলাকায় শোকের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। রাত ১১টার দিকে বড় শলুয়া কেন্দ্রীয় কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।
তবে তদন্ত ও ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত আজমুলকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে—এটি চূড়ান্তভাবে বলা যাচ্ছে না। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তা তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।
খুলনায় ভাত চুরির দায়ে শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ বাবার কাছে দাবি করা হয় এক লাখ টাকা, ময়নাতদন্ত শেষে চুয়াডাঙ্গার বড় শলুয়া গ্রামে দাফন



